বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করতে তারেক রহমানের আহ্বান

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২২ জুন ২০২৬ ১৭:০৭

ছবি: সংগৃহীত ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সোমবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান এ আহ্বানের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেছি। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একমত হয়েছি যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী; যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাস পায়।’

দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। প্রথমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বক্তব্য দেন। পরে তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বক্তব্য দেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আনোয়ার ইব্রাহিমকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম যে শুভেচ্ছাবার্তা পেয়েছিলাম, তা ছিল প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের। তিনি আমাকে অভিনন্দন এবং মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর (আনোয়ার ইব্রাহিম) আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।

পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিল। একই সঙ্গে শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথাও স্মরণ করছি। তাঁর সেই সফর আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করেছিল।’

মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তিতে দুই দেশের এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।

মালয়েশিয়ায় উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, দেশটির সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা–ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আরও একবার মালয়েশিয়া সরকার এবং দেশটির জনগণকে তাঁদের বন্ধুত্ব ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানাই। আমরা মধুর স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরছি।’

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ব্যাপক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মতবিনিময় করেছি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আজ আমরা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পরামর্শপ্রক্রিয়াসহ বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়েছি এবং বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

আজকের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা–সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় হওয়াকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এসব উদ্যোগ আমাদের সহযোগিতাকে আরও সুদৃঢ় এবং সম্পর্কের ইতিবাচক গতিধারা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের আলোচনা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমরা যৌথ সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা করছি।’

বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের কাছ থেকে শক্তিশালী জনসমর্থন পেয়েছে। জনগণের বিপুল সমর্থনের ভিত্তিতে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আমরা একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমি মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের এসব সুযোগ কাজে লাগানোর আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।’

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আলোচনায় ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর ও অন্যান্য উচ্চ মূল্য সংযোজন খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তাঁদের অবদান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাঁদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রত্যাশা করে।’

একই সঙ্গে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) যোগদানে আগ্রহী বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযুক্তি প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানাই। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশাবাদী।’

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তাঁর সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বাংলাদেশের জনগণ তাঁদের স্বাগত জানাতে পারলে গর্ব বোধ করবে।’

দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে দেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়সহ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: