ফাইল ছবি
কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক পরিদর্শন করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, প্রাণ ফিরেছে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে, বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে গুগল-মেটা-টিকটকের কাছ থেকেও।
দেশের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ সরেজমিনে দেখতে শনিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক পরিদর্শনে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ কথা বলেন।
সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিদর্শনের অংশ হিসেবে মন্ত্রী এই পরিদর্শনে যান। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে ৬-৭ টি শিল্পকারখানা পরিদর্শন করেন।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে আইসিটি খাতে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার অঙ্গীকার রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, বিএনপি সরকার ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে ‘ন্যাশনাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ বাস্তবায়ন এবং এআই হাব ও সফটওয়্যার-অ্যাপ-হার্ডওয়্যার উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিসক্যাল ও নন-ফিসক্যাল প্রণোদনার প্রস্তাবনাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর ২০০২ সালে দেশের প্রথম ‘আইসিটি পলিসি-২০০২’ প্রণয়ন করা হয়, যেখানে ICT Infrastructure, Software Industry Promotion, Technology-Based Industrial Zone (হাই-টেক শিল্পাঞ্চল) স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেই নীতির ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ২৩১.৬৫ একর জমিতে দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২০১৬ সালে আরও ৯৭.৩৩ একর জমি যুক্ত হয়ে বর্তমানে পার্কের মোট আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭১ একরে।
মন্ত্রী আরও বলেন, মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পর দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে জমি ও রেডি স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সফটওয়্যার, অ্যাপ, হার্ডওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে এ পর্যন্ত মোট ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ৮৫টির মধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে, ২৮টি নির্মাণাধীন এবং আরও ১৭টি শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু করবে।
পার্কে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৬৩৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা)। আর এ পর্যন্ত সরকার মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম যথাযথভাবে গড়ে তোলা গেলে পার্কটি থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে মন্ত্রী জানান।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন- চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট প্রায় ৬২৯ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এর ফলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কেবল দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং ভবিষ্যতে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা-উন্নয়ন ও রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ও হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে পার্কটিতে ৩টি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী (অনর, শাওমি ইত্যাদি), ২টি ল্যাপটপ উৎপাদনকারী, ১টি এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন উৎপাদনকারী, ৬টি ফাইবার অপটিক্যাল কেবল উৎপাদনকারী এবং ৩টি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (হুন্দাইসহ) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া আইওটি ডিভাইস, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, কিওস্ক ও এটিএম মেশিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। ২টি কোম্পানি ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা (ফেসবুক) ও টিকটকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন।
সম্ভাবনার পাশাপাশি পার্কটির সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অসম্পূর্ণ মৌলিক অবকাঠামো দ্রুত সম্পন্ন করা, নিরাপত্তা ও সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ডাবল লাইন সংযোগ স্থাপন, গ্যাসলাইন সংযোগ, প্রশাসনিক ও সামাজিক অবকাঠামো সম্পন্ন করা এবং বিনিয়োগকারীদের সেবা দিতে জনবল ঘাটতি পূরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য কাস্টমস হাউস সেবা চালু করা, অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ, নিয়মিত রেল যোগাযোগ চালু এবং বিদ্যমান এসআরও সংশোধন বা পরিমার্জনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিনিয়োগবান্ধব নীতির প্রনয়ণের প্রশ্নে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জানান , হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা, হাই-টেক পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণ এবং মেনুফ্যাকচারের পাশাপাশি অ্যাসেম্বেলদেরও সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের শুল্ক-কর রেয়াত, স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা এবং ইভি ব্যাটারি, সোলার ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি, ই-বাইকের মতো নতুন প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির প্রস্তাবও তৈরি করা হচ্ছে।
অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগের গতি আরও বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
সর্বোপরি প্রযুক্তি শিল্পের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়ার জন্য বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর মর্মে মন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও হাই-টেক শিল্পের জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের ইকোসিস্টেম তৈরি করা, শিল্প-একাডেমিয়া-সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি এবং বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে মেইড ইন বাংলাদেশ হাবে পরিণত করা হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর এই পরিদর্শন দেশের হাই-টেক শিল্পের বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এ সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো: ফজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সফরের শুরুতে মন্ত্রী কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের (ইউএফটিবি) একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: