04/10/2026 যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির মূল্য চোকাতে হচ্ছে ওয়াশিংটনের
মুনা নিউজ ডেস্ক
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:৪৩
ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দেখায় এটিকে ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য মনে হলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। চুক্তির শর্ত, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির অবনতি মেলালে স্পষ্ট হয়ে যায় — এই যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে।
বুধবার রাত ৮টার মধ্যে চুক্তি না হলে ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই সময়সীমার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে তিনি নিজেই পিছু হটে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসার এই দৃশ্য বিশ্বের সামনে মার্কিন অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরান প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে রাজি হয়েছে বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে এই জলপথে তাদের 'কর্তৃত্ব' এখনো অটুট। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই জাহাজ চলাচল করতে হবে। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে আরও প্রকাশ্য ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল — যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে বড় ক্ষতি।
এর বাইরে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে যা চাওয়া হয়েছে তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের সাধারণ কাঠামো মেনে নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এই দাবি সরাসরি খণ্ডন করেনি।
সামরিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের মূল উপাদান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর তেহরানের প্রভাবও বহাল তবিয়তে রয়েছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে কিন্তু বাস্তবতা বলছে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে এবং আঞ্চলিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
ঘরের ভেতরেও ট্রাম্প এই যুদ্ধ ও তার ভাষা নিয়ে চারদিক থেকে চাপে পড়েছেন। আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে— এই হুমকি দিয়ে তিনি শুধু বিরোধীদের নয়, নিজের দলের সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদেরও ক্ষেপিয়ে তুলেছেন। ডেমোক্র্যাটরা আরও একধাপ এগিয়ে ট্রাম্পের অপসারণ দাবি করেছেন।
বিশ্বের দৃষ্টিতে এর ক্ষতি আরো গভীর। একসময় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। একজন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে একটি দেশের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন — ইতিহাসে এমন নজির নেই। এই ভাষা ও এই যুদ্ধ বিশ্বের বাকি দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে দেখবে, তা স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।
যুদ্ধবিরতিতে তেলের দাম কিছুটা কমেছে, শেয়ারবাজার চাঙা হয়েছে — এটুকু স্বস্তি মিলেছে। কিন্তু পরবর্তী দুই সপ্তাহের আলোচনা যে অত্যন্ত কঠিন হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইরানের দাবির তালিকা দেখলে বোঝা যায়, এই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য চুকানো এখনো বাকি।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.