05/14/2026 ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধারে লড়ছেন গাজার স্বেচ্ছাসেবকরা
মুনা নিউজ ডেস্ক
৭ মে ২০২৬ ২৩:৩৮
গাজার ঐতিহাসিক গ্রেট ওমারি মসজিদের প্রাচীন লাইব্রেরির ভেতরে ভাঙা এক শেলফ থেকে ভারী একটা বই টেনে বের করলেন রনীম মুসা। হাতে ছোট একটা ব্রাশ, তাই দিয়ে খুব সাবধানে ধুলোর আস্তর ঝেড়ে ফেললেন তিনি। এরপর পাশে থাকা সহকর্মীর হাতে বইটা তুলে দিলেন, যিনি নরম এক টুকরো কাপড় দিয়ে সেটা মুছে সাফ করে নিলেন। দুজনে মিলে বইটা বয়ে নিয়ে গেলেন এক কোণায়, যেটাকে তারা নাম দিয়েছেন ‘সবচেয়ে নিরাপদ কোণা’। উদ্ধার করা বইগুলো আপাতত সেখানেই জমা করে রাখা হচ্ছে।
গাজায় চলমান গণহত্যার সময় ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচার বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক সংগ্রহের দুর্লভ বই আর পাণ্ডুলিপিগুলো বাঁচানোর কাজটা মোটেও সহজ নয়। অত্যন্ত ধৈর্য আর উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে তারা এই উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট মিডলইস্ট আই’র প্রতিনিধি আহমেদ দ্রেমলি গাজা সিটির এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের এই লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেছেন।
৩৫ বছর বয়সী রনীম মুসা আহমেদ দ্রেমলিকে বলছিলেন, ‘পুরো লাইব্রেরিটা বোমার স্প্লিন্টার আর পাথরের টুকরোয় ভরে গিয়েছিল। আশ্রয় নেয়া রাস্তার পশুদের মলমূত্রে মাখামাখি হয়েছিল চারপাশ। মেঝেতে শত শত বই আর ছেঁড়া কাগজ পাথরের নিচে চাপা পড়েছিল।’
রনীম মুসা আরবি ভাষায় মাস্টার্স করেছেন। তিনি গাজা সিটির ‘আইজ অন হেরিটেজ ইনস্টিটিউট’র একদল ফিলিস্তিনি নারী স্বেচ্ছাসেবকের সাথে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। যেকোনো উপায়ে নিজেদের সম্পদ রক্ষা করার এই মিশনকে তারা বলছেন ‘ফার্স্ট এইড’ বা প্রাথমিক চিকিৎসা।
রনীম জানান, শুরুতে তারা পাথর সরিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করেছেন। তাদের কাছে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের কোনো বিশেষ সরঞ্জাম বা অ্যালকোহলের মতো পরিষ্কারক দ্রব্য নেই। তাই একদম সাধারণ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন তারা—শুকনো কাপড়, সাধারণ ব্রাশ আর ভেজা বইগুলো বাতাসে শুকিয়ে নেয়া।
গাজার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীনতম এই গ্রেট ওমারি মসজিদের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। এক সময় এখানে ফিলিস্তিনি মন্দির ছিল, পরে রোমান মন্দির ও গির্জা হয় এবং সবশেষে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এটি মসজিদে রূপান্তর করা হয়। এই মসজিদের লাইব্রেরিটি ফিলিস্তিনের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম। এখানে প্রায় ২০ হাজার বইয়ের বিশাল সংগ্রহ ছিল, যার মধ্যে ১৮৭টি ছিল অতি দুর্লভ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। গাজায় দুই বছর ধরে চলা গণহত্যার মধ্যে ইসরাইলি বাহিনী অন্তত তিনবার এই মসজিদে বোমা মেরেছে। এর ফলে মসজিদ আর লাইব্রেরি—দুটোই এখন ধ্বংসস্তূপ।
কিন্তু এত অবরোধ, ঘরবাড়ি হারানো আর চরম অভাবের মধ্যেও রনীম আর তার সঙ্গীরা হার মানেননি। তারা তাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে চান। রনীম মুসা খুব আবেগ নিয়ে বলেন, ‘এই লাইব্রেরির যে শিক্ষামূলক আর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে, তা প্রমাণ করে এই মাটি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ঘর। গত কয়েক মাস ধরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, বৃষ্টি আর ছত্রাকের প্রকোপে এই পাণ্ডুলিপিগুলোর অবস্থা খুব দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। পাতাগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছিল। যখনই আমার হাতের স্পর্শে কোনো একটা পাতা ছিঁড়ে যায়, আমার মনে অপরাধবোধ কাজ করে। মনে হয় যেন ইতিহাসের কোনো এক সাক্ষী মারা গেল।’
সম্পদের চরম সংকট সত্ত্বেও রনীম আর তার দল দমে যাননি। তারা একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন—কার পক্ষে কষ্ট করে লাইব্রেরিতে আসা সম্ভব, তা ঠিক করা হয়। গাজার অধিকাংশ মানুষ এখন ঘরছাড়া, রাস্তাঘাট আর গাড়িঘোড়া ধ্বংস হয়ে গেছে, জ্বালানির ভীষণ অভাব। ফলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যেমন কঠিন তেমনি অনেক খরচসাধ্য।
রনীম বলছিলেন, ‘আমার ভয় হয় কোনো একদিন হয়তো দির আল-বালাহতে আমার তাঁবু থেকে গাজা সিটির এই লাইব্রেরিতে আসার যাতায়াত খরচটাও আমি জোগাড় করতে পারব না।’
উত্তর গাজার জাবালিয়াতে রনীমের নিজের বাড়িটি ইসরাইলি বোমায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরাইলি সেনারা এলাকাটিকে ‘নো-গো জোন’ বানিয়ে রাখায় তিনি আর সেখানে ফিরতে পারছেন না।
রনীম মুসার মতে, বোমার মতো শীতের বৃষ্টি আর ভেজা বাতাসও এখন তাদের বড় শত্রু। ঘরবাড়ি না থাকায় তারা উদ্ধার করা বইগুলো নিজেদের কাছেও রাখতে পারছেন না। কারণ তারা নিজেরাই এখন কোনোমতে তাঁবুতে থাকছেন। তাই ক্ষতিগ্রস্ত লাইব্রেরির একটা কোণায় বইগুলো পরিষ্কার করে বিষয়ভিত্তিক সাজিয়ে রাখছেন তারা। কিন্তু সেখানেও বইগুলো নিরাপদ নয়।
রনীম জানান, ছাদ ফুটো থাকায় ভবনটি বইগুলোকে কোনো সুরক্ষা দিতে পারছে না। বারবার ধুলো জমছে, আবার পরিষ্কার করতে হচ্ছে। তারা এখন সময়ের সাথে পাল্লা দিচ্ছেন যাতে বৃষ্টির পানি বইগুলো নষ্ট করতে না পারে। তারা আশা করছেন, কোনোভাবে যদি কিছু তহবিল জোগাড় করা যেত, তবে বইগুলো রাখার জন্য ভালো শেলফ কেনা যেত এবং সবকিছুর একটা ডিজিটাল আর্কাইভ করা সম্ভব হতো।
তাদের মতে, শিক্ষিত প্রজন্ম যদি এই সম্পদ রক্ষা না করে, তবে পরের প্রজন্মের জন্য কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
আইজ অন হেরিটেজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ৩৩ বছর বয়সী হানিন আল-আমাাসি জানান, ২০০৯ সালে শুধু নারীদের নিয়ে এই সংগঠনটি তৈরি হয়েছিল। শুরু থেকেই তারা গাজার দুর্লভ বই আর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ করছেন। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এক সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির সময় আমাসি যখন প্রথমবার লাইব্রেরিটিতে ঢোকেন, তখন যা দেখেন তা তাকে স্তব্ধ করে দেয়। তিনি মিডলইস্ট আই’কে বলেন, ‘ইসরাইলি হামলায় অসংখ্য বই আর পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেকগুলো ইঁদুর খেয়ে ফেলেছে, আবার অনেক বই বাস্তুচ্যুত মানুষ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছে। কারণ গাজায় রান্নার গ্যাসের ভয়াবহ সংকট চলছে।’
এই গ্রন্থাগারে আইন, ভূগোল আর প্রাচীন ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রা নিয়ে এমন কিছু অমূল্য নথি ছিল, যা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। আমাসি বিশ্বাস করেন, ইসরাইলিরা পরিকল্পিতভাবে গাজার আর্কাইভ সেন্টারগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যাতে ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস আর স্মৃতি মুছে ফেলা যায়।
তিনি পুরনো এক কষ্টের কথা মনে করে বলেন, ২০১৪ সালের হামলার সময়ও ইসরাইলিরা গাজা সিটিতে তাদের অফিসের ওপর বোমা মেরেছিল। সেই হামলায় তাদের দলের পাঁচজন নারী স্বেচ্ছাসেবক নিহত হন। তারা ভেবেছিলেন অফিসের ভবনটি নিরাপদ হবে, তাই সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখনো তাদের শত শত বই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
এত শোক আর রাগের মধ্যেও তারা কাজ থামাননি। তারা নতুন অফিস নিয়ে শত শত বই আর দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি বিমান হামলায় সেই ভবনটিও মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। আমাসি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা আবারো আমাদের সব গ্রন্থাগার হারালাম।’
এত কিছুর পরেও আমাসি আর তার দল হাল ছাড়তে নারাজ। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। আমি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু সবাই এখন খাবার আর চিকিৎসার মতো জরুরি মানবিক সাহায্য নিয়ে ব্যস্ত। আমি মনে করি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন আমাদের জিজ্ঞেস করবে, আমরা আমাদের ইতিহাস বাঁচাতে কী করেছিলাম।’
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.