06/14/2026 পারমাণবিক আলোচনা সংকটপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানোয় ইউরেনিয়ামের মজুদের নিরাপত্তা জোরদার করল ইরান
মুনা নিউজ ডেস্ক
১৩ জুন ২০২৬ ১৬:৩২
গত কয়েক সপ্তাহে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রায়-উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন ভান্ডার সিল করে দেওয়ার তৎপরতা ব্যাপক বাড়িয়ে দিয়েছে ইরান। মজুতাগারের সুড়ঙ্গগুলো পরিকল্পিতভাবে ধসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেইসঙ্গে প্রবেশপথগুলোতে বিস্ফোরক মাইন রেখে পাতা হচ্ছে বুবি-ট্র্যাপ। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র এ খবর জানিয়েছে।
প্রায় আধা টন ওজনের এই উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কাছে পাওয়া এখন অনেক বেশি কঠিন, বিপজ্জনক ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এক মাস আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ওই সময়ই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে এই ইউরেনিয়াম জব্দের নির্দেশ দিতে পারেন তিনি।
ইরানিদের তৈরি করা এই নতুন প্রতিরক্ষা দুর্গ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত চুক্তিতে জটিলতার নতুন স্তর যোগ করেছে। তেহরানের সঙ্গে ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য এই ইউরেনিয়াম অপসারণ ও ধ্বংস করা। কিন্তু ইরানের এই পদক্ষেপের পর এখন প্রশ্ন হচ্ছে—বিপজ্জনক এই সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ইউরেনিয়াম বের করার ঝুঁকি আসলে কে নেবে?
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের কূটনৈতিক মিশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তাৎক্ষণিকভাবে সিএনএনের প্রশ্নের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউসও।
চলমান যুদ্ধ অবসান ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনায় এই পরমাণু উপাদান উদ্ধার করাকে আমেরিকার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বারবার উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। ইরান এই প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।
শুক্রবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দুই পক্ষই চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সেই ইউরেনিয়াম ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করে ইরান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হবে।
তবে এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ও ইরানি কর্মকর্তারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তগুলো এখনো অস্পষ্ট। শুক্রবার ইরানের একটি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থায় প্রস্তাবিত চুক্তির একটি খসড়া ফাঁস হয়ে যায়। তাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ট্রাম্প।
কয়েকটি সূত্র বলছে, খোদ ইরানিদের জন্যও এখন এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উপাদান বের করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে ভারী খননযন্ত্র ও মাইন নিষ্ক্রিয়করণ অভিযান—যা একাধারে জটিল ও বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অফিস অভ নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়াল রিমুভাল-এর সাবেক প্রধান স্কট রোকার বলেন, 'এ খবর সত্যি হলে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করার প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবেই জটিল হয়ে পড়বে।'
ইরানকে চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতা এড়ানোর বড় সুযোগও করে দিতে পারে এই পদক্ষেপ।
রোকার বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যদি এমন 'শর্ত দেন যে যাচাইকরণের জন্য ইরানকে পুরো মজুত একটি কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসতে হবে এবং শেষপর্যন্ত সেই উপাদান সরিয়ে ফেলতে হবে কিংবা তার তেজস্ক্রিয়তা কমাতে', তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের 'সম্পূর্ণ তালিকা সরবরাহ' এবং তা বের করে আনার পুরো দায়ভার পড়বে তেহরানের ওপর।
কিন্তু রোকার সতর্ক করে বলেন, 'এমন পরিস্থিতিতে, আমার আশঙ্কা, ইরান হয়তো দাবি করে বসবে যে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটা অংশ আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ফলে ইরান ভবিষ্যতে কোনো একসময় আবারও সেটির নাগাল পাবে না—এমন শতভাগ নিশ্চয়তা আমরা পাব না।'
আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা, এই ইউরেনিয়াম মজুতের সিংহভাগই রয়েছে মধ্য-ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের ধসে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলোর ভেতর। বাকি অংশ অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই পারমাণবিক উপাদান জব্দ করার জন্য বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। তবে শেষপর্যন্ত ঝুঁকি মাত্রাতিরিক্ত মনে হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।
কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে মাটির নিচে যেখানে তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুঁতে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেই স্থাপনাগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও নিশ্ছিদ্র করে তুলেছে ইরান।
সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা যে বিপজ্জনক, তা আগেই স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। মে মাসে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে ইরানিরা কখনোই মাটির নিচে চাপা পড়া এই পারমাণবিক উপাদানের নাগাল পাবে না বা উদ্ধার করতে পারবে না।
তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, ওই ইউরেনিয়াম ভান্ডারকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জনসমক্ষে এনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই হয়তো ইরানকে উসকে দিয়েছেন। ফলে তেহরান নিজেদের সম্পদ আরও কড়া পাহারায় মুড়ে ফেলার তাগিদ পেয়েছে।
এখন আগামী সপ্তাহের মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চুক্তি সই হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে আরও কারিগরি দরকষাকষির প্রয়োজন হবে।
ইরান থেকে এই ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে হলে সম্ভবত টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অধীনস্থ ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটি বিশেষায়িত মোবাইল ইউরেনিয়াম ফ্যাসিলিটিকে মোতায়েন করতে হবে। চলতি মাসের শুরুর দিকে শীর্ষ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ওই ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেছিলেন।
তবে দুনিয়ার সেরা পরমাণু অপসারণ বিশেষজ্ঞরা মাঠে নামলেও এই মিশন শেষ করতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। এই মাসের শুরুতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইউরেনিয়াম পুরোপুরি সরিয়ে নিতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.