06/24/2026 চলমান ইরান আলোচনায় ভ্যান্সের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছেন ট্রাম্প
মুনা নিউজ ডেস্ক
২৩ জুন ২০২৬ ১৯:৩৪
ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বারবার জটিল করে তুলছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানি নেতাদের সঙ্গে সপ্তাহান্তে চলা আলোচনার সময় ট্রাম্প আবারও বোমা হামলা শুরুর হুমকি দেন।
ট্রাম্প জানান, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনা করা ইরানি প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশে ফিরতে পারবে না। এমনকি তাদের ফেরার মতো কোনো দেশও থাকবে না।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় সামনের সারির প্রতিনিধি হিসেবে ভ্যান্সের দায়িত্ব ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। কারণ, তিনি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য ও পদক্ষেপ বারবার সেই প্রচেষ্টায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এই ঘটনা তার সর্বশেষ উদাহরণ।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, প্রথম দফার আলোচনা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য 'একটি সফল ভিত্তি' তৈরি করেছে। তবে এখন তাকে এমন একটি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পথ খুঁজতে হবে, যার বিরোধিতা তিনি শুরু থেকেই করেছিলেন। একই সঙ্গে তাকে সামাল দিতে হবে ট্রাম্পের অনিশ্চিত ও খামখেয়ালি অবস্থান এবং এমন এক প্রতিপক্ষকে, যারা অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হুমকিতে প্রভাবিত না হওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, গতকাল আমরা ইরানিদের বলেছি, তারা যদি উসকানিমূলক বা অসত্য বক্তব্য দেয়, তাহলে ট্রাম্প তার প্রতিক্রিয়া জানাবেন—এটাই স্বাভাবিক।
সংঘাত নিরসনে দুই পক্ষ ইতোমধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে এবং এখন ৬০ দিনের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
তবে ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়নের সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে ভ্যান্সের জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ।
গত সপ্তাহে শান্তি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প বলেন, 'এটা সফল হলে কৃতিত্ব আমি নেব। আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে দোষ দেব জেডিকে।'
ভ্যান্স এ মন্তব্যকে রসিকতা বলে উল্লেখ করলেও ট্রাম্প অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে অন্যের ওপর দায় চাপাতে দ্বিধা করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার ভবিষ্যৎ তিনি কীভাবে সামাল দেবেন, তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ফলাফল এবং ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো করিম সাদজাদপুর বলেন, ভ্যান্স ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছেন। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারলে তিনি কৃতিত্ব পেতে পারেন। আবার এমনও হতে পারে, তাকে 'যুক্তরাষ্ট্রের অপমানজনক পরিস্থিতির নকশাকার এবং এমন এক চুক্তির স্থপতি' হিসেবে দেখা হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত প্রতিপক্ষকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ছাড় দেয়।
ভ্যান্সের কাজ শুধু ট্রাম্প ও ইরানি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করা নয়; তাকে এমন একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর [আইআরজিসি] নেতাদের সহযোগিতাও পেতে হবে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরী। ফলে তার কূটনৈতিক দায়িত্ব আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সাদজাদপুর বলেন, 'কোনো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকের জন্যই এটি সুবিধাজনক অবস্থান নয়, বিশেষ করে একজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্টের জন্য।'
তার মতে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং জ্বালানির দাম কমানোর দাবি জানালেও যুদ্ধ কীভাবে শেষ হয়, সেটিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমে যায়। ওই প্রত্যাহার অভিযানে ১৩ জন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিহত হয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, 'আমেরিকানরা যুদ্ধ পছন্দ করে না, তবে পরাজয়কে আরও বেশি অপছন্দ করে।'
রোববার সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন ভ্যান্স। তবে তিনি দেশটি ছাড়ার পরপরই সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির যে ভিত্তির কথা বলেছিলেন, তাতে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে।
ভ্যান্স বলেন, ইরান জাতিসংঘের পারমাণবিক পরিদর্শকদের দেশটিতে আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে।
তবে ইরান জানায়, তারা 'কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি দেয়নি'।
ভ্যান্স আরও একটি সম্ভাব্য অর্থায়ন পরিকল্পনার কথা বলেন, যার আওতায় কাতার ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করবে এবং সেই অর্থ দিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, ভুট্টা ও গম কিনবে। কয়েক ঘণ্টা পর ওভাল অফিসে ট্রাম্পও একই পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ইরানি জনগণের জন্য খাদ্য 'শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আমাদের কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হবে'।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা এর আগেও বলেছেন, ওই অর্থ দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজে ব্যয় করা হবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। একদিকে উভয় দেশের কর্মকর্তারা নিজ নিজ দেশের জনমতকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে সংঘাতের অবসান ঘটানোর উদ্যোগও চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভ্যান্স প্রকাশ্য মতপার্থক্যের বিষয়টিকে গুরুত্বহীন করে দেখানোর চেষ্টা করেন।
ওয়াশিংটনে ফেরার জন্য এয়ার ফোর্স টুতে ওঠার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'আমি শুধু গণমাধ্যমকে বলব, ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখছেন, তার সবকিছু পুরোপুরি বিশ্বাস করবেন না। তারা আলোচকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা অগ্রগতি করছি।'
ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভ্যান্সের আগের সরাসরি বৈঠকের তুলনায় এটি ছিল ভিন্ন সুর। সে সময় পাকিস্তানে ২১ ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন, ওখানকার 'খবর খারাপ' এবং আলোচনায় কোনো অগ্রগতি সম্ভব হয়নি।
আলোচনা ও নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প তার সহযোগী ও মিত্রদের কাছে জানতে চেয়েছেন, ভ্যান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো যোগ্যতা আছে কি না।
ট্রাম্প প্রায়ই ভ্যান্সের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর তুলনা করেন। চলতি সপ্তাহে তিনি দুজনকে আরও ভালোভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন, যখন রুবিও ইরান চুক্তি নিয়ে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সফর করবেন।
ভ্যান্স ও রুবিও কেমন করছেন—এ প্রশ্নের জবাবে সোমবার ট্রাম্প বলেন, তারা 'অসাধারণ কাজ' করছেন।
রুবিও সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসাধারণ। আমার মনে হয়, তিনি হয়তো সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচিত হবেন। আর সকালে জেডি ভ্যান্সকেও অসাধারণ মনে হয়েছে। আমি সুইজারল্যান্ড থেকে তার সংবাদ সম্মেলন দেখেছি। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান একজন ব্যক্তি। তিনি দারুণ কাজ করেছেন।'
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.