কাতারকে কূটনীতি, গণমাধ্যম ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করা এবং পরে ঐতিহ্য ভেঙে স্বেচ্ছায় ছেলের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া সাবেক শাসক শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কাতার নিউজ এজেন্সি রোববার তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তবে মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, টানা ১৮ বছর কাতারের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৩ সালের জুনে ক্ষমতা ছাড়েন শেখ হামাদ। জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ কাতারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার প্রধান স্থপতি ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বেই এক প্রজন্মেরও কম সময়ে কাতার একটি পিছিয়ে থাকা দেশ থেকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
লন্ডনের বিখ্যাত হ্যারডস ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিকানা নেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী স্যাটেলাইট সংবাদ নেটওয়ার্ক ‘আল জাজিরা’ প্রতিষ্ঠা করেন শেখ হামাদ।
বর্তমানে উত্তর আফ্রিকা থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত কাতারের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে দেশটি, যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখা ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে উপস্থিত থেকে কাতারিদের কাছ থেকে শেখ হামাদ ব্যাপক করতালি পান।
তার নেতৃত্বে কাতারের উত্থান দেশটির জনগণকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেও আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে তিনি অস্বস্তি তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে কাতার শিয়া মতবাদের অনুসারী ইরান, ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস এবং মিসরের নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
আল জাজিরার সরাসরি ও স্পষ্ট সংবাদ পরিবেশন আরব গণমাধ্যমের প্রচলিত আনুগত্যপূর্ণ ধারার বাইরে গিয়ে প্রশংসা পেলেও সমালোচনার মুখে পড়ে। কাতারের শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিল রেখে সংবাদ পরিবেশন করার অভিযোগও ওঠে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে শেখ হামাদ বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যৎ তোমাদের সামনে, এই দেশের সন্তানদের সামনে। তোমরা এমন এক নতুন যুগের সূচনা করবে, যেখানে তরুণ নেতৃত্ব বিশ্বে কাতারের পতাকা তুলে ধরবে।’
তিনি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নিজের ছেলে যুবরাজ শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ছেলেকে প্রস্তুত করেছিলেন আরও আগে থেকেই। ব্রিটেনে পড়াশোনা শেষে ৩৩ বছর বয়সে বাবার স্থলাভিষিক্ত হন শেখ তামিম।
সাধারণত শান্তিপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে বিরল। ওই অঞ্চলে সাধারণত ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে শাসকের মৃত্যু বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাধ্যমে। অবশ্য শেখ হামাদ নিজেই ১৯৯৫ সালে রক্তপাত ছাড়াই ‘প্রাসাদ অভ্যুত্থানের’ মাধ্যমে তার বাবা শেখ খলিফাকে সরিয়ে ক্ষমতা নিয়েছিলেন।
তার ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই আরব বসন্তের পর সংস্কার ও তরুণ জনগোষ্ঠীর উপযোগী নেতৃত্বের দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাতারের আগাম পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন।
সে সময় শেখ হামাদের দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন বলেও গুঞ্জন ওঠে। ধারণা করা হয়, অসুস্থতার কারণেই তিনি দেশ শাসনে আর উপযোগী ছিলেন না। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কাতারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ছুটিতে থাকা অবস্থায় পা ভেঙে যাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে সুইজারল্যান্ড নেওয়া হয়েছিল।
শেখ হামাদ ব্রিটেনের সামরিক একাডেমি স্যান্ডহার্স্টে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি কাতারের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে তাকে যুবরাজ করা হয়। ধীরে ধীরে কাতারের বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদের পরিকল্পনার দায়িত্বও তার হাতে আসে।
বাবার কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার পর শেখ হামাদ দ্রুত অভ্যন্তরমুখী দেশকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল আল জাজিরা, যা পরে বিশ্ব গণমাধ্যমে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
আল জাজিরার সংবাদ পরিবেশন শুধু আরব বিশ্বের অনেক নেতাকে ক্ষুব্ধ করেনি বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও উত্তেজনা তৈরি করেছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযানের সময় কাতারে পেন্টাগনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরবরাহ কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও আল জাজিরা জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার বক্তব্য প্রচার করেছিল।
শেখ হামাদ ক্রীড়াক্ষেত্রকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করেন। এর চূড়ান্ত সাফল্য ছিল কাতারের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার অর্জন। তবে বিপুল অর্থ ব্যবহার করে দরিদ্র দেশগুলোর সমর্থন কেনার অভিযোগে এ উদ্যোগ সমালোচনার মুখেও পড়ে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে কাতারের উপস্থিতি স্পষ্ট হয় স্পেনের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তি এবং ফ্রান্সের ফুটবল ক্লাব প্যারিস সাঁ-জারমাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা অর্জনের মাধ্যমে।
শেখ হামাদ কাতার এয়ারওয়েজকে বড় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থায় পরিণত করার উদ্যোগ নেন। প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চেয়েছিল কাতার। রাজধানী দোহার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, আর বিমানবন্দরটির নামও শেখ হামাদের নামে রাখা হয়েছে।
কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের ভূমিকা তৈরির ক্ষেত্রেও শেখ হামাদের বড় স্বপ্ন ছিল। বছরের পর বছর ধরে সুদান, লেবাননের রাজনৈতিক বিরোধ এবং ফিলিস্তিনের হামাস ও ফাতাহর মধ্যকার বিভক্তি নিরসনে কাতার মধ্যস্থতা করেছে।
২০১২ সালের অক্টোবরে হামাস নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাঁচ বছর পর শেখ হামাদ প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গাজা উপত্যকা সফর করেন। সেখানে তিনি ৪০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। তার সফরের সময় গাজার বেতার কেন্দ্রগুলোতে ‘ধন্যবাদ কাতার’ শিরোনামের গান প্রচার করা হয়।
তবে হামাসের প্রধান প্রতিপক্ষ ইসরায়েলের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছিল কাতার। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হামাদ। গাজায় ২০০৮ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলের হামলার জবাবে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া পর্যন্ত দোহায় ইসরায়েলের একটি বাণিজ্য কার্যালয় চালু রাখার অনুমতি দিয়েছিল কাতার।
২০২০ সালে প্রতিবেশী বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও কাতার সেই পথ অনুসরণ করেনি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইসরায়েলিরা বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি পতাকা এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য দাবি করা ভূখণ্ড দখলের বিষয়ে ক্ষোভের মুখোমুখি হন।
আরব বসন্তের সময় কাতার ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন লিবিয়া অভিযানে যুদ্ধবিমান পাঠায় এবং মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল লিবীয় বিদ্রোহীদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেয়।
সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরোধীদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সমর্থক ছিল কাতার এবং তারা দেশটির বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিল।
তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো ইসলামপন্থি সংগঠনগুলোর প্রতি কাতারের সমর্থন আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। শেখ তামিমের শাসনামলে সেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। বাহরাইন, মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েক বছর ধরে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে। এর অন্যতম কারণ ছিল শেখ হামাদের সময়কার নীতির ধারাবাহিকতা।
শেখ হামাদের ক্ষমতা ছাড়ার আগে নেওয়া শেষ দিকের অন্যতম উদ্যোগ ছিল আফগানিস্তানের তালেবানের জন্য আনুষ্ঠানিক কার্যালয় খোলা। এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি করে, যার ফল হিসেবে ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহার ঘটে।