08/11/2026 মডেল প্রশিক্ষণের জন্য মূল্যবান বই ধ্বংস করে দিতে পারে এআই: দুর্লভ বই বিক্রেতাদের আশঙ্কা
মুনা নিউজ ডেস্ক
১০ আগস্ট ২০২৬ ২০:৩৬
'কখনো কখনো বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়েও বই নিজেই আপনাকে বেশি কিছু বলে,' বলছিলেন টিম হোয়াইট। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলসন হলে অস্থায়ী তাকের ওপর প্লাস্টিকের আবরণে যত্ন করে রাখা মলাটবাঁধাই বই ও পুস্তিকাগুলো সাজাচ্ছিলেন তিনি।
এই সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মেলবোর্নের দুর্লভ বইমেলার জন্য নিজের দোকানের পসরা সাজাচ্ছিলেন হোয়াইট। তার 'বুকস ফর কুকস' নামে নিজের একটি বইয়ের দোকান আছে। তার মতো বই বিক্রেতাদের কাছে বইয়ের ভেতরে কী লেখা আছে, তার পাশাপাশি বইটি নিজেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু।
হোয়াইট বলেন, 'খাবার ও সমাজের মধ্যে যেখানে সম্পর্ক তৈরি হয়, আমরা সেসব বিষয় নিয়ে আগ্রহী। তাই আমরা সবসময় এর নতুন নতুন দিক খুঁজে দেখি। এমন জিনিস খুঁজি, যেগুলো এই সম্পর্কের অস্বাভাবিক দিকগুলো তুলে ধরে এবং মানুষ হিসেবে আমাদের সম্পর্কে আরও কিছু জানতে সাহায্য করে।'
'আমাদের বেশির ভাগ দুর্লভ বই বিক্রেতাই এ কাজ করেন। আমরা এমন সব জিনিস হাতে নিই, যেগুলোর পেছনে একটি গল্প আছে।'
তবে দুর্লভ বইয়ের বিক্রেতা ও বিশেষজ্ঞরা এখন ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। তাদের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন লেখা সংগ্রহ করে নিজেদের প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এসব বই ধ্বংস করে ফেলতে পারে।
এই আশঙ্কার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রে বইয়ের লেখকদের করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে একটি কপিরাইট মামলা। এ বছরের শুরুর দিকে প্রকাশ করা আদালতের নথিতে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি 'ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং' পদ্ধতি ব্যবহার করছিল।
এই পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটি ছাপা বই কিনে সেগুলোর বাঁধাইয়ের মেরুদণ্ডের অংশ কেটে ফেলত। এতে বইয়ের পাতাগুলো আরও দ্রুত ও সহজে স্ক্যান করা যেত। স্ক্যান করার পর বইয়ের বাকি অংশ মণ্ডে পরিণত করে ফেলে দেওয়া হতো। প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টাও করেছিল।
তবে বিচারক রায় দেন, যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট আইনের অধীনে এই কাজ বৈধ। কারণ এটি 'রূপান্তরমূলক ব্যবহার' হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এখন ধারণা করা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ ধরনের বই ধ্বংসের পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও বাড়ছে।
অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো বইয়ের বিক্রেতারা তাই ভাবছেন, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়েছেন কি না। কারণ সম্প্রতি তারা এমন অনেক বইয়ের ক্রয়াদেশ পেয়েছেন, যা তাদের স্বাভাবিক ক্রেতাদের আচরণের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।
একাধিক বিক্রেতা 'গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে' জানিয়েছেন, তারা কানাডার 'জুম বুকস' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বইয়ের ক্রয়াদেশ পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বই পুনর্ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচয় দেয়।
এসব ক্রয়াদেশ সাধারণত বড় পুরোনো বইয়ের বাজারের মাধ্যমে এসেছে। এসব বাজারে সস্তা কাগজের বই থেকে শুরু করে দুর্লভ ও দামি বই—সব ধরনের বই পাওয়া যায়।
ভিক্টোরিয়ার বেনাল্লায় 'গুড রিডিং সেকেন্ডহ্যান্ড বুকস' পরিচালনা করেন ডেলফিনা ম্যানর। তিনি বলেন, মে মাসে জুম বুকসের কাছ থেকে তিনি এমন ক্রয়াদেশ পেয়েছিলেন, যাতে তিন বাক্স ভর্তি বই ছিল। পরে তাকে প্রতিষ্ঠানটিকে লিখে অনুরোধ করতে হয়, যেন ভবিষ্যতে তারা একসঙ্গে এত বেশি বইয়ের অর্ডার না করে।
ম্যানর বলেন, 'তারা বইয়ের দাম আগেই পরিশোধ করেছিল এবং ডাক খরচ নিয়েও কোনো দর-কষাকষি করেনি। কিন্তু বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি। সেগুলো খুঁজে বের করা, প্যাকেট করা এবং একটি বইও বাদ পড়েনি তা নিশ্চিত করা—সবকিছু করতে গিয়ে আমি একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।'
মেলবোর্নের 'সেইন্সবারিজ বুকস'-এর মালিক জন সেইন্সবারিও একই সময়ে জুম বুকসের কাছ থেকে অনেকগুলো ক্রয়াদেশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০২৬ সালের 'রেয়ার বুক ফেয়ার'-এ প্রদর্শিত চতুর্দশ শতাব্দীর একটি দুর্লভ বইয়ের বাক্স। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
তার দোকানের অনলাইন তালিকায় থাকা বিভিন্ন বইয়ের জন্য এসব অর্ডার এসেছিল। বইগুলোর দামের ব্যাপারে ক্রেতাদের কোনো ধরনের দর-কষাকষি বা আগ্রহ ছিল না। বইগুলোকেও মনে হয়েছে পুরোপুরি এলোমেলোভাবে বাছাই করা হয়েছে।
এর মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বই, খুব কম দামের বই এবং কখনো কখনো কয়েক দশক পুরোনো বই। এসব অর্ডারের কারণে সেইন্সবারিজকে বিদেশে একাধিক বাক্স বই পাঠাতে হয়েছে।
সেইন্সবারি তার প্রতিষ্ঠানকে 'একটি প্রাচীন বইমেলায় অংশ নেওয়া সাধারণ বই বিক্রেতা' হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ তারা শুধু দুর্লভ বই বিক্রি করেন না।
একই ধরনের ক্রয়াদেশ পাওয়া অন্য বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা গেছে। তবে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত বই বিক্রেতাদের কাছে এ ধরনের অর্ডার দেওয়া হয়নি বলে মনে হচ্ছে।
কিছু বিক্রেতা ধারণা করছেন, জুম বুকস হয়তো পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় প্রচলিত একটি কৌশল অনুসরণ করে বই কিনছে—কম দামে কিনে অন্য জায়গায় বেশি দামে বিক্রি করা। তবে তাদের কাছে ক্রয়াদেশগুলোর ধরন তারপরও অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
একটি ক্রয়াদেশে ১৯৭০-এর দশকে প্রকাশিত মাটির প্রকৌশলবিষয়ক একটি নির্দেশিকা বইয়ের সঙ্গে ২০১০ সালে প্রকাশিত 'বর্ন টু থান্ডার: চ্যাম্পিয়নস অব নিউজিল্যান্ড সাইক্লিং' নামের একটি বই কেনা হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল ১৯৮২ সালে প্রকাশিত 'আর্লি অস্ট্রেলিয়ান পোয়েট্রি' নামের একটি সংকলন এবং মেলবোর্নের হথর্ন এলাকার স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক একটি বই।
কবিতার বইটি মাত্র ৯ ডলারে বিক্রি হয়েছিল এবং ২০ বছর ধরে সেটি দোকানের তাকেই পড়ে ছিল।
হোয়াইট বলেন, বিষয়টি 'একটি আকর্ষণীয় দ্বন্দ্ব' তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, 'যদি এটি ২০ ডলারের একটি বই হয় এবং অস্ট্রেলিয়ায় এর ৫ লাখ কপি থাকে, তাহলে আমি খুব একটা দুঃখ পাব না। তবে কপিরাইট নিয়ে আমার অন্য ধরনের উদ্বেগ থাকবে।'
'কিন্তু যদি বইটির মধ্যে এমন কোনো গল্প থাকে, যা একে বিশেষ করে তোলে, অথবা সেটি যদি একটিমাত্র কপি হয়, তাহলে সেটিকে ধ্বংস করার পরিণতি ভয়াবহ।'
বিরাট পরিমাণ বইয়ের মজুতের তালিকা তৈরি করা এবং সেগুলো বিক্রি করা বই বিক্রেতাদের জন্য এমনিতেই কঠিন। তাই এ ধরনের বিক্রি তাদের কাছে সবসময় খারাপ বিষয় নয়।
স্ত্রী জেনির সঙ্গে 'গ্রান্টস বুকশপ' পরিচালনা করেন নিক ডওয়েস। তার হিসাব অনুযায়ী, তাদের গুদামে প্রায় ৫ লাখ বই রয়েছে।
জুম বুকস ‘সেন্সবারিজ বুকস’-এর জন সেন্সবারিকে আপাতদৃষ্টিতে বেশ কিছু এলোমেলো বইয়ের অর্ডার দিয়েছিল। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।
ডওয়েস বলেন, 'কেউ যদি এসে আমার সব বই কিনে নিয়ে সেগুলো কেটে টুকরো করতে চায়, তাহলে এক দিক থেকে আমি অসন্তুষ্ট হব। আবার অন্য দিক থেকে খুশিও হব। কিন্তু কেউ যদি আমাকে বলে, "দেখুন, এটি এই বইয়ের একমাত্র পরিচিত কপি। আমি এটিকে কেটে ফেলতে চাই"—তাহলে আমি বলব, আমার মনে হয় আমি বরং এটি আপনাকে পাঠাতে চাই না।'
লাভের জন্য বই ধ্বংস করার ঘটনা অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রথম শুরু করেনি। কিছু বিক্রেতা দুর্লভ বই কিনে সেগুলো কেটে ভেতরের ছবিগুলো আলাদা করে বিক্রি করেন।
'শাতেলাইন বুকস'-এর দুর্লভ বই বিক্রেতা গুইনেথ টড বলেন, 'আমি যখন কোনো বই বিক্রি করার পর দেখি, সেই বইয়ের ছবিগুলো আলাদাভাবে বিক্রি হচ্ছে, তখন বিষয়টি আমার কাছে শারীরিকভাবেই খুব খারাপ লাগে।'
তিনি ক্রেতাদের যাচাই-বাছাই করেন, যাতে বইগুলো 'ভুল জায়গায়' না যায়।
'আমার কাছে বই শুধু একটি বস্তু নয়।'
অ্যানথ্রপিকের একজন মুখপাত্র বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কখনো জুম বুকসের কাছ থেকে বই কেনেনি। তবে তিনি বলেন, 'বড় ভাষা মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বই সংগ্রহ করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি।'
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তারা মূলধারার বাণিজ্যিক বাজার থেকে বই সংগ্রহ করে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র বলেন, 'আমাদের কোনো তথ্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে দুর্লভ বা প্রাচীন বই কিনে সেগুলো ধ্বংস করা হয় না।'
জুম বুকসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ম্যানরূপ গিল সাম্প্রতিক এক পেশাগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক মাসে 'আগ্রাসীভাবে ব্যবসা প্রসারিত করছে।'
এর আগে জুম বুকস বই ধ্বংস করে সেগুলোকে ডিজিটাল রূপ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র 'গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে' বলেন, 'আমরা পুরোনো বই সংগ্রহ করি এবং সেগুলো অক্ষত অবস্থায় আবার বিক্রি করি। আমরা বইকে ডিজিটাল রূপ দিই না। আমাদের অগ্রাধিকার সবসময় বই পুনর্ব্যবহার করা। আর কোনো বই যখন আর নতুন কারও কাছে দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন আমরা সেটিকে দায়িত্বশীলভাবে পুনর্ব্যবহার করি।'
জুম বুকস অক্ষত অবস্থায় কেনা বই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিংয়ের জন্য বিক্রি করে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
তবে কোম্পানিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর কাছে ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিংয়ের জন্য অক্ষত বই বিক্রি করেছে কি না তা প্রকাশ করেনি এবং বলেছে, 'আমাদের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোতে গোপনীয়তার শর্ত রয়েছে। তাই আমরা আমাদের ক্রেতাদের বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা আলোচনা করি না।'
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.