কারাকাসে ডেলটা ফোর্সের অভিযানে স্ত্রীসহ আটক নিকোলাস মাদুরো

মুনা নিউজ ডেস্ক | ৩ জানুয়ারী ২০২৬ ১৯:০৬

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে তুলে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।

দেশটির রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা চালিয়ে তাদেরকে আটক করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর ডেলটা ফোর্স অভিযান চালিয়ে তাদেরকে তুলে নিয়ে আসে।

ডেল্টা ফোর্স হল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাস দমন ইউনিট।

এদিকে, হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ স্যোশালে’ তিনি এ তথ্য জানান।

ট্রাম্প ওই পোস্টে জানান, “যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলায় একটি বৃহৎ পরিসরে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। সেই সঙ্গে দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ আটক করে দেশ থেকে বের করে নিয়ে এসেছে।”

তিনি বলেন, “এই অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছিল। বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে জানানো হবে। বেলা ১১ টায় মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হবে।”

এর আগে ভেনেজুয়েলা সরকার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অভিযোগ করে বলে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বেশ কয়েকটি রাজ্যে বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তারা এই হামলাকে সরাসরি ‘সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানী কারাকাস ছাড়াও মিরান্ডা, আরাগুয়া এবং লা গুয়াইরা রাজ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে। কারাকাসের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করার উদ্দেশ্যেই এই আক্রমণ চালিয়েছে। তবে তাদের সেই চেষ্টা ‘সফল হবে না’ বলেও বিবৃতিতে অঙ্গীকার করা হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সারাদেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্যমতে, রাজধানী কারাকাসে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) তাদের বাণিজ্যিক বিমানগুলোকে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এটিকে তারা ‘চলমান সামরিক তৎপরতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল এভিয়েশন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএএর এই বিধিনিষেধ জারির পরই কারাকাসে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক দিন ধরে মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও আক্রমণের মূল লক্ষ্য হবে মাদক চোরাচালান বন্ধ করা। অন্যদিকে মাদুরোর দাবি—ট্রাম্প আসলে ভেনেজুয়েলাকে উপনিবেশ বানাতে চাইছেন। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের আসল নজর ভেনেজুয়েলার বিশাল জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদের দিকে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে দেশছাড়া করেছে। ভেনেজুয়েলা সরকার এটিকে ওয়াশিংটনের ‘চরম গুরুতর সামরিক আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। একই সঙ্গে কারাকাসের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েক নেতা এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।

ইরান

তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান বলেছে, তারা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ‘কঠোর নিন্দা’ জানায়—এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

কলম্বিয়া

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো একে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে অভিহিত করে সতর্ক করেন, এতে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক তাৎক্ষণিকভাবে আহ্বান করার আহ্বান জানান তিনি।

কিউবা

প্রথাগত মিত্র কিউবা একে ‘সাহসী ভেনেজুয়েলান জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কামনা করেছে।

রাশিয়া

রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে নিন্দা করে বলেছে, এই পদক্ষেপের কোনো গ্রহণযোগ্য অজুহাত নেই এবং আদর্শগত শত্রুতা কূটনীতিকে ছাপিয়ে গেছে।

স্পেন

স্পেন উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, তারা গণতান্ত্রিক, আলোচনাভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতায় প্রস্তুত।

জার্মানি

জার্মানি জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখেছে।

ইতালি

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কার্যালয় বলেছে, তারা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে এবং কারাকাসে অবস্থানরত ইতালীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।

বেলজিয়াম

বেলজিয়াম ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করছে বলে শনিবার জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ট্রিনিদাদ ও টোবাগোর প্রধানমন্ত্রী কমলা পার্সাদ-বিসেসর

ট্রিনিদাদ ও টোবাগোর প্রধানমন্ত্রী কমলা পার্সাদ-বিসেসর বলেছেন, ‘শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ সালের আজ সকালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ভেতরে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। ট্রিনিদাদ ও টোবাগো চলমান এসব সামরিক অভিযানের কোনো অংশ নয়। ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে ট্রিনিদাদ ও টোবাগো শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।’

ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়ভন মিউয়েংকাং বলেন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইন্দোনেশিয়া। তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানায় এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলে।’

ডেমোক্র্যাট সিনেটররা

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যুদ্ধে যাওয়ার মতো কোনো জাতীয় স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের নেই। সিনেটর রুবেন গালেগো লিখেছেন, এই যুদ্ধ বেআইনি—এক বছরেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্ব পুলিশ’ থেকে ‘বিশ্বের বুলি’তে পরিণত হয়েছে।

বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মোরালেস

ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস যুক্তরাষ্ট্রের ‘বোমা হামলা’ প্রত্যাখ্যান করেছেন তীব্রভাবে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, কারাকাসের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত প্রধান সামরিক স্থাপনা ফোর্ট তিউনার কাছাকাছি এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ওই এলাকায় হামলার মুহূর্ত ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্যে আরও দাবি করা হয়েছে, জেনারালিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার সময় কারাকাসের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সিএইচ-৪৭ চিনুক হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে। প্রশস্ত অ্যাঙ্গেলের কিছু ফুটেজে শহরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার দৃশ্য রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: