ছবি : সংগৃহীত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগের দিনের দেওয়া বক্তব্যের কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ না। বরং দেশটির বর্তমান নেতৃত্বের ওপর চাপ বজায় রেখে জ্বালানি তেলের ওপর সামরিক ‘কোয়ারেন্টাইন’ বা অবরোধ বজায় রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।
রুবিওকে প্রশ্ন করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলা শাসন করবে। তখন তিনি ইরাক যুদ্ধের মতো কোনো দখলদার প্রশাসনের কথা বলেননি। বরং তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো মাদুরোর অনুসারীদের মাধ্যমে পরিচালিত বর্তমান সরকারকে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হবে।
সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোকে ভেনেজুয়েলায় ঢুকতে বা বের হতে বাধা দেবে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী। এই বাধা ততক্ষণ চলবে যতক্ষণ না ভেনেজুয়েলা তাদের তেলশিল্প বিদেশি বিনিয়োগের (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান) জন্য খুলে দিচ্ছে।
রুবিও বলেন, ‘এই অবরোধ জারি থাকবে এবং এটি আমাদের জন্য বিশাল এক শক্তির জায়গা। এটি ততক্ষণ বজায় থাকবে যতক্ষণ না আমরা সেখানে পরিবর্তন দেখছি—যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থই রক্ষা করবে না, বরং ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য এক উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।’
ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ মন্তব্যের ব্যাখ্যা
পরে এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রুবিও কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, মানুষ ট্রাম্পের ‘চালানো’–সংক্রান্ত মন্তব্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি পরিষ্কার করেন, ‘এর অর্থ দেশ চালানো নয়, বরং ভেনেজুয়েলার নীতিগুলো কীভাবে চলবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা।’
রুবিও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবীয় সাগরে ট্রাম্পের মোতায়েন করা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম নৌবহর সেখানে অবস্থান করবে। এর লক্ষ্য হচ্ছে—ভেনেজুয়েলা সরকারের আয়ের মূল উৎসকে পঙ্গু করে দেওয়া।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজন হয়, তবে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আরও সৈন্য পাঠাতে পারেন। প্রেসিডেন্ট কোনো বিকল্পকেই বাদ দিচ্ছেন না।
হোয়াইট হাউস ও ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রুবিও মূলত ট্রাম্পের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। তাঁরা বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাবেন।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা সরকার প্রথম দিকে তীব্র প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর মুক্তি দাবি করে বলেছেন, ‘আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হয়েছে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল রোববার দ্য আটলান্টিক-কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ যদি ‘সঠিক কাজ না করেন, তবে তাঁকে মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে।’
তেল ও অর্থনৈতিক স্বার্থ
ট্রাম্প ও রুবিও—দুজনই ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদকে তাঁদের মূল নিশানা হিসেবে দেখিয়েছেন। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ‘আমরা সেখান থেকে প্রচুর সম্পদ আহরণ করব।’
রুবিও বলেন, ভেনেজুয়েলার সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা তেলশিল্পে আবার বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। দেশটির নিজেদের এই শিল্প পুনর্গঠন করার ক্ষমতা নেই। তাই তাদের বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
এই পুরো বিষয়টি এখন ১৯ শতকের যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতির মতো মনে হচ্ছে, যা লাতিন আমেরিকায় তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছে। ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে পারে এবং চীন-রাশিয়াকেও একই ধরনের কাজ করতে উৎসাহিত করতে পারে।
চীন, রাশিয়া এবং বর্তমান অবস্থা
ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হলো চীন। দেশটি ভেনেজুয়েলার ৮০ শতাংশ তেল কেনে। রাশিয়ারও সেখানে বড় স্বার্থ রয়েছে। অন্যদিকে শেভরন ছিল একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি, যারা বিশেষ লাইসেন্সের অধীনে সেখানে কাজ করছিল।
যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে দুটি তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে। এমনকি একটি রুশ পতাকাবাহী জাহাজকেও (বেলা ১) তারা তাড়া করেছে। রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিরোধীদের অবস্থান
রুবিও আগে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে সমর্থন করলেও এখন ট্রাম্প তাঁকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, মাচাদোর দেশ চালানোর মতো ‘জনসমর্থন’ ও ‘সম্মান’ নেই।
রুবিও আপাতত দেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গেই কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তারা মুখে কী বলছে তা নয়, বরং ভবিষ্যতে তারা কী কাজ করে, তার ওপর ভিত্তি করে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
মাদক পাচার ও কিউবা প্রসঙ্গ
রুবিও বলেন, ভেনেজুয়েলা থেকে মাদক পাচার বন্ধ করা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। গত বছর এই মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নৌযানে সামরিক হামলায় প্রায় ১১৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভেনেজুয়েলা মূলত ইউরোপে কোকেন পাঠায়। তবে ট্রাম্পের মূল উদ্বেগের বিষয় ‘ফেন্টানিল’ তারা উৎপাদন করে না।
কিউবা পরবর্তী লক্ষ্য কি না—জানতে চাইলে রুবিও সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দেননি। কিউবান বংশোদ্ভূত বাবার সন্তান রুবিও বলেন, কিউবা সরকার একটি বড় সমস্যা। তারা বর্তমানে অনেক বিপদে আছে। রুবিও মনে করেন, ভেনেজুয়েলার সরকারের পতন কিউবাতেও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: