টিউশন ফি পরিশোধের কিস্তি ব্যবস্থা বাতিল করলো হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ৫০০ জনেরও অধিক শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২৫ জুলাই ২০২৬ ১৯:১৭

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের নক্সভিলের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আজারিয়াহ মাইলসের স্বপ্ন ছিল ঐতিহাসিক কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। ভর্তি আবেদন গৃহীত হওয়ায় কয়েক সপ্তাহ পরই সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়।

আজারিয়াহ মাইলস চলতি সপ্তাহেই জানতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় তার ভর্তি বাতিল করেছে এবং আগামী ১৭ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া ফল সেমিস্টারে তাদের জন্য আর কোনো আসন নেই। তার সঙ্গে বাতিল হয়েছে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর ভর্তি।

অর্থাৎ হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া ৫০০’র বেশি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী একই ধরনের নোটিশ পেয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ‘আর্থিক বাধ্যবাধতকতা’ পূরণ না হওয়ার কথা বলে কোনো সমাধান দিতে অপারগতা জানায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। এরইমধ্যে দেশজুড়ে ভাইরাল হয়ে উঠেছে সেসব পোস্ট।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসকারী একজন স্নাতক শিক্ষার্থীর বার্ষিক গড় টিউশন ফি প্রায় ৩৮ হাজার ডলার (৪৭ লাখ টাকা) এবং আবাসন ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ ডলার (১৬ লাখ টাকা)।

আজারিয়াহর মা কেন্ড্রা মাইলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সনামধন্য এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিস্তিতে ফি পরিশোধ করার সুযোগ রয়েছে। কাজেই ব্যাপক প্রতিযোগিতার পর কেবল মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পান।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ভর্তি বাতিলের খবর জানার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ব্যবস্থা আমাদের কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনায় নিবন্ধনের সুযোগ দেয়নি। কারণ বিপুল পরিমাণ বকেয়া অর্থের কারণে আমরা ওই সুবিধার জন্য অযোগ্য বলে দেখানো হয়েছে।’

কেন্ড্রা মাইলস বলেন, ‘বুধবার হাওয়ার্ডের ইমেইল পাওয়ার পর থেকেই আমি যোগাযোগের চেষ্টা করছি। আমি আক্ষরিক অর্থেই প্রতিষ্ঠানটির সবার কাছে ইমেইল পাঠিয়েছি। এমনকি আমি ওর উপদেষ্টাকেও (স্টুডেন্ট কাউন্সেলর) ইমেইল করেছি। তিনি জবাব দিয়ে বলেছেন, এটি কোনো ভুল নয় এবং তাদের আর কিছু করার নেই।’

জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করা আজারিয়াহ মাইলস অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত হাওয়ার্ডকেই বেছে নিয়েছিলেন। তার আশঙ্কা গ্রীষ্মের ছুটি অনেকটাই শেষ হয়ে যাওয়ায় অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘সব জায়গার আবাসন বুক হয়ে গেছে। কোথাও এখন আর ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না, কারণ অনেক দেরি হয়ে গেছে। আবার কোথাও ওরিয়েন্টেশন মিস করেছি।’

তবুও হাওয়ার্ড ঘিরে আশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন মাইলস। তিনি বলেন, ‘ক্লাস শুরু হতে খুব বেশি সময় নেই এবং আমি এক বছর পড়াশোনা থেকে বিরতি নিতে চাই না।’

আজারিয়াহর মতো ১৭ বছর বয়সী আটলান্টার সানিয়াহ কলিন্সও বুধবার জানতে পারেন যে তারও ভর্তি বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মা ভর্তিচ্ছুক অন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন অনেক শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করা হচ্ছে।’

সানিয়াহ জানান, বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠানো এক ইমেইলে তাকে জানানো হয়, ১০ জুলাইয়ের মধ্যে টিউশন ফি পরিশোধ অথবা অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করার সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় আর তার জন্য আসন ধরে রাখতে পারছে না।

তবে ফল সেমিস্টারের জন্য অধিকাংশ বকেয়া এরইমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সানিয়াহ বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। হাওয়ার্ডই ছিল আমার সবকিছু। উচ্চমাধ্যমিকের পুরো শেষ বছর এবং পুরো গ্রীষ্মজুড়ে আমি নিয়মিত বৃত্তি নিশ্চিতের জন্য চেষ্টা করেছি। আমরা সব সময় চেষ্টা করেছি অন্যদের চেয়ে দশ ধাপ এগিয়ে থাকতে, যাতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকে।’

এদিকে শুক্রবার এক ইমেইল বার্তায় হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এপিকে ৫০২ শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিলের তথ্য নিশ্চিত করেছে। এতে বলা হয়, ভর্তির তালিকায় জায়গা পাওয়া শিক্ষার্থীদের আগেই ফি পরিশোধের সময়সীমা জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই সেই সম্যের মধ্যে ভর্তি–সংক্রান্ত শর্ত ও আর্থিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারেনি। কাজেই এমন ৫০২ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি বাতিলের নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, মার্চ মাস থেকেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ই-মেইল এবং ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির মাধ্যমে ভর্তি–সংক্রান্ত শর্ত, অর্থ পরিশোধের সময়সীমা, পরিমাণ সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে জানানো হচ্ছিল।

কর্তৃপক্ষের ভাষায়, ‘আর্থিক সহায়তার আবেদনকারী শিক্ষার্থী ও প্রকৃত ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত ফি নির্ধারণের সময়ে পার্থক্য থাকতে পারে।’

‘যেসব শিক্ষার্থী মনে করেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া তাদের আর্থিক হিসাব প্রকৃত আর্থিক স্বচ্ছলতার সঠিক প্রতিফলন করেনি, তারা দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনে সংশোধন বা পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে’ বলেও ঘোষণা দিয়েছে হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। গত ফল সেমিস্টারে সেখানে স্নাতক পর্যায়ে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হন।

রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞ মেরিবেথ গ্যাসম্যান বলেন, কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য যত্নশীল ও সহায়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ঐতিহাসিক কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুনাম রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিলের ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির জন্য নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি এই পরিস্থিতিতে থাকতাম এবং বিষয়টি ৫০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে নিয়ে হতো, তাহলে একদিনে এমন সিদ্ধান্ত নিতাম না। প্রত্যেকের আবেদন আলাদাভাবে যাচাই-বাছাই করতাম। এখন শেষ পর্যন্ত তাদের আবার সেই কাজই করতে হবে।’

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নক্সভিল ক্যাম্পাসের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক অধ্যাপক রবার্ট কেলচেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে হয়তো শিক্ষার্থীদের বড় অঙ্কের বকেয়া ছিল। কাজেই কর্তৃপক্ষ মনে করেছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সেই অর্থ পরিশোধ করবে না, অথবা তাদের নতুন সেমিস্টারে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেশি যে বৃত্তির আবেদনকারী ও বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে তারা স্বচ্ছলতা প্রমাণ করা অন্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়ার কথা ভেবেছেন।’

শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে উচ্চশিক্ষার বৃত্তির জন্য আবেদন করতে সহায়তাকারী ও হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক না থাকা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্কলারশিপ কলেজ মামা এলএলসি’-এর পরিচালক ল্যাভার্ন মিকেন্স জানান, বুধবার ও বৃহস্পতিবার হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বাতিলের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে তিনি ৪০০টিরও বেশি ইমেইল পেয়েছেন।

তারা সবাই আতঙ্কিত ও কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানান মিকেন্স। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা ভেঙে পড়েছেন। অনেকে অভিভাবক বলছেন-আপনি কি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন? হাওয়ার্ড আমাদের ভর্তি বাতিল করেছে।’



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: