ফাইল ছবি
বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কয়েকশ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের এ পরিকল্পনার আওতায় ক্যারিবীয় অঞ্চল, মধ্য আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পে নতুন করে অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অথচ গত বছর বাজেট ও জনবল সংকোচনের সময় এসব কর্মসূচির অনেকগুলোই স্থগিত করা হয়েছিল।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকায় পুরোনো সমুদ্রতলদেশীয় টেলিযোগাযোগ ক্যাবল প্রতিস্থাপনে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা গত সপ্তাহে কংগ্রেসকে জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য, ওই অঞ্চলের যোগাযোগ অবকাঠামোয় চীনের প্রভাব কমিয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে আরও দেখা গেছে, পশ্চিম গোলার্ধ, আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় ৫০ কোটি ডলারের নতুন কর্মসূচি বিবেচনা করা হচ্ছে। নথিতে বলা হয়েছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই পানামা খালের দুই প্রান্তের বন্দরে চীনের মালিকানা, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং লাতিন আমেরিকার টেলিযোগাযোগ খাতে চীনা বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য, চীনের অনেক প্রকল্প শুরুতে কম ব্যয়বহুল মনে হলেও পরে অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, গোপন খরচ ও নিম্নমানের কারণে সেগুলো আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
নতুন পরিকল্পনার আওতায় বেসরকারি ক্যাবল কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বে বিদেশি সরকারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকার পুরোনো সাবমেরিন ক্যাবলের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র বা মিত্র দেশগুলোর প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনে অর্থায়ন করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর আওতায় এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, হাইতি ও নিকারাগুয়াসংলগ্ন সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পে সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নিকারাগুয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে দেশটির সরকারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করবে না যুক্তরাষ্ট্র।
এপি বলছে, এসব উদ্যোগের বড় অংশই এমন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আগে অর্থ ব্যয় করলেও গত বছর ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ ব্যয় সংকোচন কর্মসূচির সময় সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় ইউএসএআইডির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে গুটিয়ে ফেলা হয় এবং বিশ্বজুড়ে শত শত কূটনৈতিক পদ বিলুপ্ত হওয়ায় চীন মোকাবিলার বহু প্রকল্পও স্থগিত হয়ে পড়ে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চীনবিরোধী উদ্যোগে অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়ে প্রশাসনের আগ্রহ রয়েছে। তবে অধিকাংশ প্রকল্প এখনো আলোচনার পর্যায়ে থাকায় তিনি বিস্তারিত জানাননি।
অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, পুনরায় চালুর বিবেচনায় থাকা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা ও বেলিজে নিরাপত্তা কার্যক্রম কেন্দ্র স্থাপন, যাতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সাইবার প্ল্যাটফর্মে চীনের সম্ভাব্য হুমকি পর্যবেক্ষণ করা যায়। এছাড়া ইকুয়েডর, জ্যামাইকা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়েকে বন্দর ব্যবস্থাপনা, অবৈধ গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, দালাই লামার উত্তরসূরি নির্বাচনকে ঘিরে চীনের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা, নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়ন, চীনের মহাকাশ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক সমর্থন কমানো এবং নজরদারি ও সেন্সরশিপ প্রযুক্তি রপ্তানিতে আগ্রহী চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম প্রতিহত করার উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে, বাইডেন প্রশাসনও ২০২৪ অর্থবছরে বিশ্বজুড়ে ৫০টির বেশি চীনবিরোধী প্রকল্পে ৩৪ কোটি ডলারের বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প এখনো স্থগিত রয়েছে।
এদিকে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সম্প্রতি ফিলিপাইনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বড় আকারের বিনিয়োগ—এই দুই কৌশলই এখন একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: