১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন: পররাষ্ট্র দপ্তর

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১১ আগস্ট ২০২৬ ২১:০০

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশি নাগরিকদের এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।

অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যাপকভাবে ভিসা ও অভিবাসন সুবিধা বাতিল করে আসছে। এর ফলে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বা অভিবাসনের সুযোগ থাকা বহু বিদেশি নাগরিকও বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন।

পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে বলেছে, যেসব বিদেশি নাগরিক ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন, অপরাধে জড়িয়েছেন, আমেরিকান নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানিয়েছেন, আমেরিকানদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছেন কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছেন- তাদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র দফতরের তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার পর।

এর মধ্যে হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ ছিল ভিসা বাতিলের প্রধান কারণ।

বিভাগটি কয়েকটি নির্দিষ্ট মামলার কথাও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আরেকজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য একজনের বিরুদ্ধে শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণ রাখার এক ডজনেরও বেশি অভিযোগ রয়েছে।

পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, এসব ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর আফ্রিকার একটি দূতাবাস শতাধিক বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। পররাষ্ট্র দফতরের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে এমন বাবা-মা ছিলেন, যারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই দেশটিতে গিয়েছিলেন।

এই প্রবণতাকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলা হয়। এর মাধ্যমে সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়- এমন উদ্দেশ্যে বিদেশি বাবা-মায়েরা যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, এ ধরনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভিসা বাতিলের তালিকায় এমন কয়েকজন বিদেশিও রয়েছেন, যারা রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ডকে ‘উদযাপন’ করেছিলেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর দাবি করেছে।

দফতর জানিয়েছে, তাদের মধ্যে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য করেছিলেন যে, কার্ক ‘দেরিতে মারা গেছেন’।

ওই ধরনের বক্তব্যকে সহিংসতা সমর্থন বা উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন।

ভিসা বাতিলের এই সংখ্যা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ব্যাপকতার একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছিল, তখন পর্যন্ত এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। সে সময় সেটিকে ভিসা বাতিলের রেকর্ড সংখ্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এর পর কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকেই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক ও কঠোর অভিযান শুরু করে তার প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিলেন, যাদের বৈধ ভিসা ছিল।

শুধু বিদ্যমান ভিসা বাতিল নয়, নতুন করে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে।

আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড আরও ব্যাপকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা যাচাই ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রিনিংয়ের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো অপরাধী, প্রতারণাকারী এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করতে পারে- এমন ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকানো।

তবে এই নীতির সমালোচনা করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকার বিশেষজ্ঞরা।

অভিবাসন ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাইয়ের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে।

তাদের মতে, ভিসা আবেদনকারীদের রাজনৈতিক মতামত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা অনলাইন কর্মকাণ্ডের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

অভিবাসন অধিকারকর্মীদের কেউ কেউ এই নীতিকে ‘নজরদারি’ এবং বিদেশিদের নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তাদের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও বক্তব্য বা মতামতকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার, ভিসা যাচাই কঠোর করা এবং বিদেশিদের অনলাইন কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ- সব মিলিয়ে অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন।

এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা সেই কঠোর নীতিরই প্রতিফলন।

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যদিকে অধিকারকর্মীরা বলছেন, নিরাপত্তার যুক্তিতে ভিসা ও অভিবাসন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে বৈধ ভ্রমণকারী ও অভিবাসীরাও অযথা হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।

ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যাপক ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতিতে কঠোরতার নতুন মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: