ফাইল ছবি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্দেশে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে শিশুদের জন্য কম টিকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং মাম্পস, হাম ও রুবেলা (এমএমআর) টিকাগুলো আলাদা করে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, আজ যেসব টিকা দিতে হয়, কয়েক দশক আগে এর মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ দেওয়া হতো শিশুদের। সেই সময় মানুষ অনেক বেশি সুস্থ ছিল এবং অবশ্যই বর্তমানে যে উচ্চ হারে অটিজম দেখা যাচ্ছে, তা ছিল না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এমএমআর টিকার নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। তবে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই টিকা এবং অটিজমের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
এই নির্দেশে আরও সুপারিশ করা হয়েছে যে, শিশুদের জন্য টিকার সংখ্যা আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস বা এএপি-এর বর্তমান সুপারিশকৃত ১৮টি থেকে কমিয়ে ১১টি করা হোক।
ট্রাম্পের এই আদেশটি একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে, কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশ হিসেবে নয়। কারণ স্কুলে উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় টিকার বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে রাজ্য পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়।
ওভাল অফিসে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসন শিশুদের জন্য ‘সবচেয়ে গুরুতর ও বিপজ্জনক রোগের বিরুদ্ধে মাত্র ১১টি মূল টিকাদান’ সুপারিশকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
এই নির্দেশ অনুযায়ী সব শিশুর জন্য সুপারিশকৃত টিকাগুলো হলোÑ হাম, মাম্পস, রুবেলা, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, হুপিং কাশি, পোলিও, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি, নিউমোকক্কাল রোগ, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস এবং ভ্যারিসেলা বা চিকেন পক্স।
ট্রাম্প বলেন, আমরা সেগুলো কমাচ্ছি। বিষয়টি শুধু এই নয় যে আপনি কম টিকা, অথবা যেমন বলা হয়, কম 'সুঁইয়ের খোঁচা' দিচ্ছেন; বরং সেগুলো চিকিৎসকের কাছে বার বার গিয়েই দেওয়া হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দেন যে এমএমআর টিকা একসঙ্গে দেওয়া হলে তা ‘বেশ প্রাণঘাতী’ হতে পারে। তিনি এটিকে একটি শিশুর শরীরে এক বোতল সোডা ঢেলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
একজন সাংবাদিক 'প্রাণঘাতী' দাবির প্রমাণ জানতে চাইলে ট্রাম্প বললেন, আমি যা শুনেছি, কিছু লোক বলে যে বিষয়টি সেরকমই।
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশান (সিডিসি)-এর মতে, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এমএমআর টিকার কারণে জ্বরজনিত খিঁচুনির খুব সামান্য ঝুঁকি থাকে। যাদের গুরুতর অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে, তাদের টিকা নেওয়ার আগে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করার উপদেশ দেওয়া হয়।
সংস্থাটি জানায়, যারা এমএমআর টিকা নেন, তাদের বেশিরভাগেরই এতে কোনো গুরুতর সমস্যা হয় না এবং এই টিকা গ্রহণ করা হাম, মাম্পস বা রুবেলা হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার মধ্যে বেশি সময়ের ব্যবধান রাখলে শিশুরা সেই সময়ের মধ্যে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, অথবা একাধিকবার টিকা নিতে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করার আশঙ্কা বাড়ে।
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসির মতে, সমন্বিত এমএমআর টিকাকে তিনটি পৃথক টিকায় ভাগ করার কোনো উপকারিতা আছে, এমন কোনো প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ট্রাম্পের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের (এইচএইচএস) সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র বলেছেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের লক্ষ্য অভিভাবকদের পছন্দের সুযোগ দেওয়া, শিশুদের টিকার প্রাপ্যতা বন্ধ করা নয়। ২০২৫ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কেনেডি টিকা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পরিবর্তন ও শিথিল করার চেষ্টা করে আসছেন।
গত সপ্তাহে সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে ডানা ব্যাশের সঙ্গে ২০ মিনিটের এক উত্তেজনাপূর্ণ সাক্ষাৎকারে কেনেডি বলেন, তিনি কখনোই এমএমআর টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই নির্দেশ কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের শিশুরা আগের টিকাদান সূচির অধীনে সুপারিশকৃত ৭২টি ডোজের তুলনায় অনেক কম টিকা পাবে।
তবে টিকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা অতিরঞ্জিত। কারণ এতে এমএমআর-এর মতো সমন্বিত টিকাকে একাধিক ইনজেকশন হিসেবে গণনা করা হয়েছে এবং বার্ষিক ফ্লু ও কোভিড-১৯ টিকাও ধরে নেওয়া হয়েছে।
ফেডারেল সরকারের এই নতুন সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই। বিদ্যালয়ে উপস্থিতির জন্য যেসব টিকা বাধ্যতামূলক, সেগুলো রাজ্য পর্যায়ে নির্ধারিত হয়।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের প্রেসিডেন্ট ডা. অ্যান্ড্রু রেসিন ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশকে ‘বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এমন এক সময়ে এটি এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়েও হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। টিকা দিতে দেরি করা বা বাদ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যখন হামের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে এবং শিশুরা স্কুলে ফিরে যাচ্ছে।
রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডিও সোমবার ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সমালোচনা করে একে ‘ভুল’ বলে আখ্যা দেন। চিকিৎসক ক্যাসিডি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, এই পরিবর্তনগুলো করার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রেসিডেন্টের নেই। টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। টিকা কার্যকর। টিকা অটিজমের কারণ নয়।
এই আইনপ্রণেতা অভিভাবকদের আহ্বান জানান, ভুল তথ্যসম্বলিত একটি নির্বাহী আদেশের বদলে টিকার বিষয়ে আপনার সন্তানের শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ শুনুন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি অটিজমের সঙ্গে শিশুদের টিকার সম্পর্ক রয়েছে এমন অগ্রাহ্য করা ধারণার কারণে অভিভাবকেরা সন্তানদের টিকা না দেন, তাহলে হামের মতো রোগ আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। একাধিক গবেষণায় এমএমআর টিকা এবং অটিজমের মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
ডেনমার্কে ২০১৯ সালে একটি উচ্চমানের গবেষণা পরিচালিত হয় ছয় লাখ ৫৭ হাজার ৪৬১ শিশুর ওপর। এতে বলা হয়, তথ্য-উপাত্ত এমএমআর টিকা অটিজম সৃষ্টি করে বা অটিজমের কারণ হতে পারে এমন ধারণা এই গবেষণা সমর্থন করে না।
নিজেদের ওয়েবসাইটে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি সুপারিশ করেছে যে শিশুদের এমএমআর সমন্বিত টিকার দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। প্রথম ডোজ ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে।
এএপি'র মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের কত ঘন ঘন এবং কতগুলো টিকা দেওয়া হবে, তা নির্ভর করে—কোন সময়ে টিকাগুলো তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে এবং কোন সময়ে তারা নির্দিষ্ট কিছু রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে।
এএপি বলছে, সুপারিশকৃত টিকাদান বিলম্বিত করা বা বাদ দেওয়ার কোনো চিকিৎসাগত কারণ নেই।
ট্রাম্পের নির্দেশে টিকায় ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের বিকল্প খোঁজার এবং সেসব বিকল্প আরও নিরাপদ ও কার্যকর কি না তা পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে।
এটি এমন দাবির পর এসেছে যে টিকায় থাকা অ্যালুমিনিয়াম লবণ অটিজম, অন্যান্য স্নায়বিক বিকাশজনিত অবস্থা বা শিশুদের গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার কারণ হয়। এএপি এসব দাবিকে ‘দীর্ঘদিনের একটি গুজব’ বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, গবেষণায় টিকায় থাকা অতি অল্প পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম লবণের সঙ্গে কোনো উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
মাটি, পানি ও খাদ্যে স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায় এমন অল্প পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম লবণ বহু দশক ধরে কিছু টিকায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
এএপি-এর মতে, এর ফলে টিকার কম পরিমাণ এবং কম সংখ্যক ডোজ প্রয়োজন হয়।
এই বিভাগের অন্যান্য খবর
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: