ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পূরণ করে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানকে অবশ্যই তাদের পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ‘অর্থবহ’ মাত্রায় কমাতে হবে। তবে তেহরানে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিষয়ে দীর্ঘদিনের সংশয়বাদী ভ্যান্স এই সংঘাতের অবসানে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। জুনে তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির মধ্যস্থতা করেছিলেন, যা পরে ভেস্তে যায়। যুদ্ধটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
সোমবার আলাস্কায় নির্বাচনী প্রচারণার সফরের পর রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে ইরান শুধু ভবিষ্যতে পারমাণবিক কার্যক্রম কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না; তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বাস্তবে কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।রাজনৈতিক খবর পড়ুন
ভ্যান্স বলেন, আপনারা যদি পারমাণবিক অস্ত্র না-ই চান, তবে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানির প্রয়োজন কেন? আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে যদি আপনারা সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন, তবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি তৈরি করবেন না। এটি একটি অত্যন্ত মৌলিক ও প্রাথমিক বিষয়।
তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয়, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করতে চাইলে তাদের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতার ক্ষেত্রে অর্থবহ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
যুদ্ধ বন্ধ এবং বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব বিনিময় করেছে। ট্রাম্প তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সতর্ক করেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার হতে পারে।
ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তিতে আগ্রহী। তবে এর জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ছাড় বা ছাড়ের প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। আমরা কেবল কথার বিনিময়ে কোনো পদক্ষেপ নেব না।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে তেহরানে আসলে কারা সিদ্ধান্ত নেন, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের অনিশ্চয়তা। ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁদের কতটা কর্তৃত্ব রয়েছে, তা অস্পষ্ট।
ভ্যান্স বলেন, আমরা একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, তাদের দেশে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয় তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্পও বলেছিলেন, তার ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা’ হলো ইরানকে আসলে কারা পরিচালনা করছে, তা কেউ জানে না।
তবে রবিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ভালোভাবেই জানেন তাদের ইরানি সমকক্ষ কারা এবং ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে। সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সমস্যাটি আসলে উল্টো; সমস্যাটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা।
ভ্যান্স জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বোঝার জন্য তিনি মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগও তিনি উড়িয়ে দেন। ইরানি বাহিনী মাঝে মাঝে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম হলেও এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করতে তারা মূলত ব্যর্থ হয়েছে।
শান্তি আলোচনায় তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন কি না— এ বিষয়ে ভ্যান্স সরাসরি কিছু বলতে রাজি হননি। তাকে প্রায়ই হোয়াইট হাউসের প্রধান আলোচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই এর সঙ্গে জড়িত। তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই পুরো বিষয়টি পরিচালনা করছেন।
এই যুদ্ধ এবং এর জন্য প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের এমন কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে চাপে ফেলেছে, যেগুলো কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভ্যান্স সংঘাত নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমালোচনা কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ভোটারদের বলেছেন, এই বিষয়টি যেন আগামী মাসের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সমর্থন করা থেকে তাঁদের বিরত না রাখে।
আলাস্কায় ভ্যান্স রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের সমর্থনে আয়োজিত এক সমাবেশে অংশ নেন। সুলিভান সেখানে ডেমোক্র্যাটিক প্রতিদ্বন্দ্বী মেরি পেলটোলার সঙ্গে পুনর্নির্বাচনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্প আলাস্কায় ১৩ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনী ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলার আগে ভ্যান্স তার বক্তৃতার বড় একটি অংশ ব্যয় ও সামর্থ্যের বিষয়টিতে, বিশেষ করে জ্বালানি খরচের ওপর কেন্দ্রীভূত করেন। আলাস্কার ভৌগোলিক অবস্থান দুর্গম হওয়ায় সেখানে নিত্যপণ্য বেশ ব্যয়বহুল এবং জ্বালানি উৎপাদন অঙ্গরাজ্যটির অন্যতম প্রধান শিল্প।
সমাবেশে উপস্থিত জনতা প্রবল উল্লাস ও হর্ষধ্বনি করে ওঠে, যখন সুলিভান ভুলবশত ভ্যান্সকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেন। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে ভ্যান্সকে রিপাবলিকানদের অন্যতম প্রধান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরে ভ্যান্স রয়টার্সকে জানান, ২০২৮ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। স্বভাবগতভাবেই আমি কাজ ফেলে রাখার বা দেরি করার প্রবণতা রাখি। তাই এ বিষয়ে আমি আসলে খুব একটা চিন্তাভাবনা করিনি।