ছবি: গ্রাফিক্স
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান ব্যক্তি চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গভর্নর। বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের প্রধানকে সরাতে আগে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন এমন নজির ছিল না। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে একাধিকবার ফেডের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্তের হুমকি দিয়েছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিরল ঘটনা।
বুধবার ঢাকায়ও এক বিরল ঘটনা ঘটলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দল কর্মকর্তার বিক্ষোভের মুখে বিদায় নিয়েছেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে নিয়োগ বাতিল করে ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন।
আহসান এইচ মনসুর আগে ছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে গভর্নর নিয়োগ দিয়েছিল। তাঁর অপসারণের ঘটনা নিয়ে বুধবার দুপুরের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়ামূলক পোস্ট দিতে থাকেন ব্যবহারকারীরা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি মূখ্য ছিল।
প্রায় চার মাস আগে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনতা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে আহসান এইচ মনসুরের সাবেক প্রতিষ্ঠান পিআরআই-এর আলোচনা সভায় আমীর খসরু বলেছিলেন, ‘আমরা (বিএনপি) কখনো বাংলাদেশ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রাজনৈতিক নিয়োগ দিইনি। বাংলাদেশের ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নয়, সংস্থাটিকে স্বাধীনতা দিতে হবে।’
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমানে অর্থমন্ত্রী। নতুন সরকার দায়িত্বগ্রহণের ৮ দিনের মাথায় বিরল প্রক্রিয়ায় গভর্নর বদল করা হলো। যেটিকে এখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলছেন অর্থমন্ত্রী। বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অগ্রাধিকার, কর্মসূচি ও নীতিগত চিন্তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিবেচনার তো কিছু নেই। একটি নতুন সরকার এসেছে, তাদের নিজস্ব প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার) আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি, অনেক জায়গায় হয়েছে এবং এটি চলমান। এটা খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’
ব্যাংক খাতে সরকারের অগ্রাধিকার কি তা উল্লেখ আছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ ও ক্ষমতায়ন অংশে বলা আছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধি করা হবে’।
কিন্তু ইশতেহারেই ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃঙ্খলা, তদারিক ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ’ অংশে বলা হয়েছে, ‘দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্ত্বশাসন, ক্ষমতা ও তদারকি শক্তিশালী করা হবে।’
বিএনপির ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ‘ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং ব্যাংক পরিচালনা নীতিমালা পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করা হবে।’ কিন্তু সরকারের নিয়োগ করা নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান খোদ সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এ গভর্নর নিয়োগে যোগ্যতার বিষয়টি নির্দিষ্ট করা নেই। নিয়োগকারী হিসেবে সরকারের কথা উল্লেখ আছে। সরকার চাইলে গভর্নরের নির্ধারিত চার বছরের মেয়াদ বাড়াতে পারবে।
গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশের একটি খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগের মাসে (সেপ্টেম্বর) গভর্নরের মর্যাদা বাড়িয়ে ও নিয়োগপ্রক্রিয়া বদলানোর প্রস্তাব করে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ -এর খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
ওই খসড়ার সঙ্গে পাঠানো চিঠিতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, গভর্নরের পদমর্যাদা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমমর্যাদায় উন্নীত হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বাড়বে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি মৌলিক কাঠামোগত পদক্ষেপ হিসেবে তা বিবেচিত হবে। গভর্নরের মন্ত্রী মর্যাদা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনতা কাঠামো (২০২১)’ এর সুপারিশের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ নামের আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে তাতে অপরাগতার কথা জানিয়েছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। গভর্নরকে পাঠানো চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এরকম মৌলিক আইন সংশোধন করা বাস্তবসম্মত নয়।’ সংশোধনের উদ্যোগটি নির্বাচিত সরকারের নেওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে বলে গভর্নরকে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা। নতুন সরকার এসে গভর্নর নিয়োগ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া সেই গভর্নরের নিয়োগ বাতিল করল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলছেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের যে প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হয়েছিল, তাতে হঠাৎ এক ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে পেশাদার অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একজন ব্যবসায়ী ও হিসাববিদকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা যেমন বিস্ময় জাগাচ্ছে; তেমনি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই অস্থিরতা আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে শঙ্কা সেলিম রায়হানের। তাঁর মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যদি ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তবে পুরো অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। কোন প্রক্রিয়ায় একজন অর্থনীতিবিদকে বিদায় করা হলো এবং কীসের ভিত্তিতে নতুন গভর্নরকে নিয়োগ দেওয়া হলো তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা উচিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে সরাতে ঢাকায় ‘মব’ হলেও ওয়াশিংটনে এখনো তেমন কিছুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ‘ভবন সংস্কার নিয়ে কংগ্রেসকে বিভ্রান্ত’ করার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে।
ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল এখনো দায়িত্বে আছেন। আগামী মে মাসে তাঁর মেয়াদ শেষ হবে। এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প কেভিন ওয়ার্শ নামের এক অর্থনীতিবিদকে নতুন চেয়ার হিসেবে মনোনীত করেছেন। বিবিসি বলছে, ওয়ার্শের শ্বশুর দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের রাজনীতির অর্থ দাতা হিসেবে পরিচিত। আর রয়টার্সকে পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে তা অর্থনীতির প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারায়।
বাংলাদেশের নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলছেন, আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, বর্তমান সরকার অতীতের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসবে। বিএনপির উচ্চ পদের নেতারাই জনগণকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পেশাদার ব্যক্তিদের দ্বারা স্বাধীনভাবে চলতে দেবেন। রাজনীতিকীকরণ করা হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আবার সেই রাজনৈতিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ছি।
সেলিম রায়হান বলছেন, যিনি নিজে ঋণখেলাপি ছিলেন বা যাঁর প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তিনি কীভাবে অন্য ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: