ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইসরায়েলের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও আরও চার বছর মেয়াদের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশার হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হয়েছেন ফলকার তুর্ক।
শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটের মাধ্যমে এই পদে পুনরায় বিজয়ী হন তুর্ক, যিনি ২০২২ সাল থেকে এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর মাধ্যমে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের পদটি সৃষ্টির পর—প্রথম ব্যক্তি হিসেবে টানা দুটি পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পেয়ে ইতিহাস গড়লেন তিনি।
অস্ট্রিয়ার আইনজীবী ফলকার তুর্ক ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে সংস্থাটির শরণার্থী বিষয়ক সংস্থায় (ইউএনএইচসিআর) কাজ শুরু করেন। তিনি মালয়েশিয়া, কসোভো, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোতে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরবর্তীতে তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদে কাজ করেন, যার মধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের অধীনে স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেশন বিষয়ক সহকারী মহাসচিব পদটি অন্যতম। গুতেরেসের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তুর্ক গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এছাড়া আফগানিস্তান, সুদান, বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং নিকারাগুয়ায় সংঘটিত সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও তিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গুতেরেসের প্রস্তাবে তুর্ককে আরও চার বছরের মেয়াদ দেওয়ার পক্ষে বিপুল সমর্থন মেলে। মোট ১৪৪টি দেশ তাঁর পক্ষে ভোট দেয়, বিপক্ষে পড়ে ১০টি ভোট এবং ১৩টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
এর আগে, আগামী সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটি স্থগিত রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব এবং তুর্কের মেয়াদ কেবল চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য রাশিয়ার একটি প্রচেষ্টা সাধারণ পরিষদে খারিজ হয়ে যায়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের পদটি সহজাতভাবেই বিতর্কিত, কারণ এই দায়িত্বের মধ্যে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর প্রকাশ্যে সমালোচনা করার মতো বিষয় থাকে।
ইসরায়েল, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে তুর্কের প্রকাশ্য ও জোরালো সমালোচনা তাঁকে এই তিন দেশের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তুর্ক বারবার গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ, লেবাননে প্রাণঘাতী হামলা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জবাবদিহিতার "লজ্জাজনক" অভাব নিয়েও সমালোচনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে "অর্থহীন" ও "জাতিসংঘ সনদ ও সব আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে অভিবাসীদের "বিমানবিকীকরণ" নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দেশটিতে "অভিবাসী ও শরণার্থীদের নিয়মিত নির্যাতন আর অবমাননার" শিকার হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুর্কের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে যে, তাঁর নেতৃত্বে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় "৭ অক্টোবরের নৃশংসতাকে আড়াল করেছে, তহবিলের অপব্যবহার করেছে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক চরমপন্থার পক্ষে জাতিসংঘের নিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়েছে।"
জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার উপ-রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি চুমাকভ তুর্কের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার অভিযোগ এনেছেন।
চলতি বছরের শেষে মেয়াদের মেয়াদ শেষ হতে চলা মহাসচিব গুতেরেসও এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যেভাবে পরিচালনা করেছেন তার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সমালোচকদের মতে, ভোটাভুটির প্রক্রিয়াতে তাড়াহুড়ো করা হয়েছে এবং নতুন মানবাধিকার প্রধান বাছাইয়ের বিষয়টি তাঁর উত্তরসূরির ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া জাতিসংঘ মহাসচিব চলতি মাসের শুরুর দিকে জাতিসংঘের বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপকে চিঠি পাঠিয়ে তুর্ককে পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানান, এবং তারমাত্র কয়েক সপ্তাহ পর এই ভোটাভুটির আয়োজন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই তাড়াহুড়ো করে নেওয়া ভোটের সমালোচনা করে বলেছে, এটি "জাতিসংঘের অন্তর্নিহিত দুর্নীতি ও অদক্ষতার আরেকটি উদাহরণ।"
যুক্তরাষ্ট্র তুর্কের বিরুদ্ধে "প্রকৃত নৃশংসতার বেলায় চোখ বন্ধ রাখা এবং তার বদলে একটি চরমপন্থী আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের" অভিযোগ তুলেছে। শুক্রবারের ভোটের আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রদূত জেফ বার্টোস দাবি করেন যে, তুর্ককে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া প্রমাণ করবে যে সাধারণ পরিষদ "কার্যকারিতা হারিয়েছে"।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুর্কের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য গুতেরেসের প্রচেষ্টাকে একটি "নৈতিক ব্যর্থতা" বলে আখ্যায়িত করেছে এবং বলেছে যে এই নির্বাচন তাঁর উত্তরসূরির জন্য রেখে দেওয়া উচিত ছিল।
তবে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেছেন, গুতেরেস জাতিসংঘের নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন এবং সদস্য রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পূর্ব পরামর্শ করে "অত্যন্ত স্বচ্ছ উপায়ে" তুর্ককে নিয়োগ দিয়েছেন।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: