ক্রিপ্টো বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করছেন বাংলাদেশের ডিজিটাল মাফিয়া

মুনা নিউজ ডেস্ক | ৪ জুন ২০২৬ ২১:৩১

ফাইল ছবি ফাইল ছবি
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টো বাণিজ্য ও অনলাইন জুয়া। অথচ বেআইনি এসব ব্যবসা পরিচালনা করে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে গেছেন ‘নেক্সট ভেঞ্চার’ ও ‘ফান্ডেড নেক্সট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডিজিটাল মাফিয়া খ্যাত সৈয়দ আব্দুল্লাহ জায়েদ। যার উত্থান আওয়ামী লীগ আমলে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এখনো তিনি চুটিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় হয়ে উঠেছেন আরও বেপরোয়া।
 
বৈদেশিক মুদ্রার (ফরেক্স) ট্রেডিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও লাইসেন্সবিহীন ডিজিটাল অর্থ (ভার্চুয়াল মানি) তৈরি, লেনদেন এবং অনলাইন ক্যাসিনো জুয়া দেশের প্রচলিত আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদেশে কালো টাকা পাচারসহ এসব অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন এই ডিজিটাল মাফিয়া। আর এজন্য তিনি দেশে ও বিদেশে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
 
সূত্রমতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই তিনি দেশের বাইরে টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত। কারাবন্দী সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনের হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে এই জায়েদের মাধ্যমে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলাও রয়েছে। ঢাকার বিজ্ঞ মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটি করেন টাঙ্গাইলের আশরাফ আলী নামে এক ব্যক্তি।
 
সূত্র জানায়, প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে আওয়ামী লীগ আমল থেকে এখন পর্যন্ত আব্দুল্লাহ জায়েদ নির্বিঘ্নে বিট কয়েনের ব্যবসা অব্যাহত রেখেছেন। মূলত এর মাধ্যমে তিনি দেশ থেকে অর্থ পাচারের ব্যবসা করে আসছেন। টাকা পাচার করতে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া ছাড়াও সংশ্লিষ্টদের অনেককে তার সঙ্গে এই অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত হতেও বাধ্য করেন। এই অবৈধ ব্যবসা যে এখনো বহালতবিয়তে চলছে- তার প্রমাণ হলো রাজধানীর বাড্ডায় অবস্থিত অফিস চালু রয়েছে। এছাড়া তার এ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটও সচল আছে।
 
স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সেসময় নির্বিঘ্নে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া জায়েদ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। এখনো তিনি প্রকাশ্যে সব অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। রহস্যজনক কারণে প্রশাসনও নীরব।
 
এ নিয়ে গণামধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হলেও জায়েদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হত্যা মামলার আসামি হয়েও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বরং আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এখনো নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বাণিজ্য করেই হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারে ব্যস্ত তিনি ও তার সিন্ডিকেট।
 
এ নিয়ে ‘নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বাণিজ্যে আঙুল ফুলে কলাগাছ জায়েদ’ শিরোনামে গত বছরের ১৮ জুন একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে তিনি প্রকাশিত তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে ব্যর্থ হয়ে সংবাদটি ওই পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে সরিয়ে ফেলতে নানামুখী অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। এজন্য একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকেও নানাভাবে অপব্যবহার করেন। এছাড়া আর কোনো রিপোর্ট না করতে প্রতিবেদককে তিনি ডেকে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের প্রলোভন দেখান।
 
গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ‘নেক্সট ভেঞ্চার’ প্রতিষ্ঠা করেন জায়েদ। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশে ব্যবসা শুরু করলেও একপর্যায়ে শুরু করেন ফরেক্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসা। এজন্য ২০২২ সালে গড়ে তোলেন ‘ফান্ডেড নেক্সট’ প্রতিষ্ঠান। তবে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজকে ঢাকায় এনে জায়েদ নিজের প্রভাব জাহির করেন। ‘ফান্ডেড নেক্সট’-এর অফিস ও কার্যক্রম রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ডস, সাইপ্রাস, হংকং ও শ্রীলঙ্কায়।
 
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে অর্থ পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমতি নেননি জায়েদ। অথচ বাংলাদেশসহ শতাধিক দেশে অবৈধ ফরেক্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়েছেন তিনি। চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে এবং দেশে-বিদেশে গড়েছেন বিপুল সম্পদ। তার বিলাসিতার কাছে হার মানবে যে কোনো ধনকুবের জীবনযাপন।
 
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে পলকসহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার নির্বাচনে স্পন্সর করেন জায়েদ। কালোটাকার দাপটে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বেসিসেও (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) বাগিয়েছেন পরিচালক পদ। আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৪ সালের ৮ মে অনুষ্ঠিত বেসিস নির্বাচনে বিপুল অর্থের বিনিময়ে ভোট কিনেন তিনি।
 
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জায়েদ বাংলাদেশের ক্রিপ্টোকারেন্সি বেচা-কেনাসহ মানি লন্ডারিং ও অনলাইন প্রতারণার অন্যতম হোতা। অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার জন্য নানা ধরনের ছলচাতুরি, কূটকৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। জায়েদ দেশের ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনা-বেচার মাস্টারমাইন্ড। কয়েক বছর ধরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে প্রতারিত করছেন।
 
ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। দেশের আইন অনুযায়ী বিটকয়েনের মতো যে কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ। লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ও দুর্নীতিবিরোধী আইনের লঙ্ঘন।
 
এক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন অর্থ পাচার হিসেবেও বিবেচিত হবে। আর জায়েদের ‘ফান্ডেড নেক্সট’ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
 
এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ আব্দুল্লাহ জায়েদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: