বাংলাদেশে বসবাসকারী ৩ লাখ ৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে স্বীকৃতি দিল মিয়ানমার

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১৬ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৩৩

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার বলেছে, বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত তিন লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের ‘সাবেক বাসিন্দা’। মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার বলেছে, বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত তিন লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের ‘সাবেক বাসিন্দা’। মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার বলেছে, বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত তিন লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের ‘সাবেক বাসিন্দা’।

সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে বলে গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও মিয়ানমার সরকারকে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছিল বাংলাদেশ।

মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ বিবৃতি এমন সময় এল, যখন রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নবম বছরে গড়িয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে একটি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর দেশটির সামরিক বাহিনী ব্যাপক দমন অভিযান শুরু করে। এরপর প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা তখন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় আগের বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা, যারা কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশে বসবাস করছিল।

২০১৭ সালের সামরিক বাহিনীর ওই অভিযানের ব্যাপকতা, পরিকল্পিত ধরন ও নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগ ওঠে। তবে রোহিঙ্গাদের দেশটির স্বীকৃত ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবে স্বীকার করে না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে দেশটি, যার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে তারা বাংলাদেশের অধিবাসী এবং অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছে।

বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা তাদের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় যাচাই করেছে মিয়ানমার। যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭

জনকে রাখাইনের ‘সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা যায়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে দেশটির ভাষায় ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে কিংবা কী প্রক্রিয়ায় এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে, বিবৃতিতে তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো ‘স্থিতিশীল’ হলে যাচাই হওয়া সাবেক বাসিন্দাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে তারা। ফলে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার কথা বলা হলেও প্রত্যাবাসনের বিষয়টি রাখাইনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে শর্তযুক্ত রাখা হয়েছে।

বিবৃতিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। একই সময়ে উত্তর রাখাইনে দুই লাখের বেশি মানুষ অবস্থান করছিল।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছর মেয়াদি একটি কাঠামোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২১ সালে সেনাবাহিনী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। এর মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একাধিক উদ্যোগ নেয়া হলেও কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি।

২০২৩ সালে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও অঞ্চলভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এ লড়াইয়ের কারণে আরো মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রাখাইনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরাকান আর্মি। ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

এদিকে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিবেশ, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট এবং নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরার সম্ভাবনা না থাকায় বহু রোহিঙ্গা বিকল্প পথ খুঁজছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রমবর্ধমানসংখ্যক রোহিঙ্গা অনিরাপদ ও চলাচলের অনুপযোগী নৌযানে করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছার জন্য বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করছে।

গত জুলাইয়ের শেষ দিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন, তার দেশে অবস্থানরত পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায় ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। তবে সে সময় মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিলেন, ওই কর্মসূচি শুধু মালয়েশিয়ার আটক কেন্দ্রে থাকা এবং যাচাই হওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে—এমন খবরও তখন তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

সেই অবস্থানের পর এবার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল মিয়ানমার। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির শর্ত এবং প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় ঘোষণাটি কবে কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: