ব্যাংক খাতে হওয়া লুটপাট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে বাংলাদেশের প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন: গভর্নর

Maisha Mumtaz | ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৩

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

ব্যাংকিং খাতে লুটপাট হওয়ায় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অর্থ সরবরাহ করে গ্রাহকদের টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, এটি করা হচ্ছে জনগণের করের টাকা দিয়েই।

শনিবার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) ওয়ান ব্যাংকের আয়োজনে বাংলা কিউআর সেবা চালু অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউআইইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম মিয়া এবং ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান।

লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে পরবর্তী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব সরকারের কাছে দেয়া হয়েছে।

এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, আমি যখন দায়িত্ব নেই তখন দেখলাম ব্যাংকের তিন ভাগের একভাগ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে কিছু লুটেরা। চুরি বলা ঠিক হবে না এটা লুট করে নিয়ে গেছে আমাদের জনগণের টাকা। এ লুট থেকে সমস্যা শুরু। তাই ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর ব্যাংকিং সেক্টরকে দেয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি।

গভর্নর আরো বলেন, এ পরিমাণ (৬০ হাজার কোটি) টাকা দিয়ে বছরে ২ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা করা যেত অথবা দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। যারা লুট করে নিয়ে গেছে সেগুলো জনগণের টাকা। আবার এ জনগণকেই এখন সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। লুট করে নিয়ে গেল আরেকজন, এখন জরিমানা দিচ্ছেন আপনি আমি। এ কথাগুলো এ জন্য বলছি, আমাদের সমাজে এ নিয়ে সচেতনতা থাকা দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে বা পিটুপি পদ্ধতিতে সরাসরি টাকা পাঠানোর সুবিধা চালু হচ্ছে। পাশাপাশি, আর্থিক খাতকে আরো সহজ ও কার্যকর করতে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তঃঅপারেটর চার্জ শূন্য করা হয়েছে। তবে লেনদেন খরচ কমলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরো পথ বাকি। বর্তমানে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড়ে ১৪৩ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।

এ ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিতে দৈনিক লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানান গভর্নর।

পিটুপি লেনদেন চালু হলে রিকশাচালক ও দিনমজুরসহ সবাই কিউআর কোডের মাধ্যমে সহজে ও স্বচ্ছভাবে টাকা লেনদেন করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ইউআইইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যাশলেস করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে স্ট্যাটিক কিউআরের পরিবর্তে আধুনিক ডাইনামিক কিউআর কোড চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন অত্যন্ত সহজে ও নিরাপদে সম্পন্ন করতে পারবেন। চাইলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও ডাইনামিক কিউআর শেয়ার করা যাবে যেটি শিক্ষার্থীদের একান্ত ব্যক্তিগত কিউআর। পরিবারের যে কেউ এটি স্ক্যান করে শিক্ষার্থীর হয়ে ফি পরিশোধ করতে পারবেন।

নতুন এ ডিজিটাল রূপান্তরের শুরুতে কিছু কারিগরি ত্রুটি বা ভুল হওয়া স্বাভাবিক উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে, নেতিবাচক প্রচার না চালিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানান ইউআইইউর উপাচার্য।

ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, দৈনন্দিন জীবনে আর্থিক সেবা যখন আরো সহজ ও সহজলভ্য হয়ে ওঠে, তখনই ডিজিটাল রূপান্তর অর্থবহ হয়ে ওঠে। ইউআইইউতে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি আন্তঃব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা লাভের পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা সম্পর্কে আরো সচেতন হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিশন বাস্তবায়নে এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ইউআইইউর সঙ্গে অংশীদার হতে পেরে আমরা আনন্দিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ার রূপকল্পের সমর্থনে ইউআইইউতে বাংলা কিউআর সেবা চালু করা হয়। ইউআইইউ শিক্ষার্থীরা এখন ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু পেমেন্টের ক্ষেত্রে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করতে পারবেন। অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও স্টল নিয়ে এতে অংশ নেয়। শিক্ষার্থী ও অতিথিরা সরাসরি ‘বাংলা কিউআর’-এর মাধ্যমে পেমেন্ট করার অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পান।