ছবি: গ্রাফিক্স
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগের গতি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, স্কুল ও হাসপাতালের মতো খাতে সরকারি ব্যয় হলে নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, শ্রম ও অন্যান্য সেবার চাহিদা বাড়ে। এটি বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং সরকারের কর রাজস্ব বাড়াতে সহায়তা করে।
উন্নয়ন প্রকল্প থমকে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেসরকারি বিনিয়োগে আগে থেকেই মন্দাভাব থাকায় এই আঘাত আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মতো প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি কমে যায়।
গতকাল বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। বিপরীতে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৫.০৯ শতাংশ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল ৭.৫০ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৮.৫৫ শতাংশ।
আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখার কারণেই এ বছর শুরুতে এমন ধীরগতি দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকল্পের কাজে এই দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও জরুরি সরকারি সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চলতি অর্থবছরে সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিলসহ এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম তিন মাসে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১৮ কোটি টাকা।
সাধারণত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতেই কেটে যায়। পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, অর্থবছরের সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত ব্যয়ের গতিও বাড়ে।
পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে সরকার ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ স্থবিরতা কাটাতে প্রকল্প পর্যালোচনার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি প্রবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার জন্য হুমকি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমে গেলে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিতেও সরকারি বিনিয়োগের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
আইএমইডির চলমান তদারকির পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের আহ্বান জানান অধ্যাপক বিদিশা। তিনি বলেন, 'তিন মাস পরও যদি কোনো প্রকল্পে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।'
কম ব্যয়ের কারণে রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়তে পারে
বিদিশা বলেন, উন্নয়ন ব্যয় কমে গেলে তা সরকারের রাজস্ব আদায়েও কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ প্রকল্পের কেনাকাটা ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে গেলে যেসব লেনদেন থেকে রাজস্ব আসে, সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কেবল এডিপির ব্যয়কে বিবেচনা না করার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো বেসরকারি খাত।
প্রকল্প পর্যালোচনার কারণে বাস্তবায়নে ধীরগতি
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এনামুল হক বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে, বিশেষ করে মার্চের আগে অনেকগুলো প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছিল। এসব প্রকল্প বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'এই যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে। আমার ধারণা, মূলত এ কারণেই বর্তমানে এডিপি বাস্তবায়নের কাজ এত ধীরগতিতে এগোচ্ছে।'
এনামুল মনে করেন, এই পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। তবে কাজ আরও পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে যত দ্রুত সম্ভব এটি শেষ করা উচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত অর্থবছরের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি আরও নাজুক। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকার সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের ৬৭.৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল।
'অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ সচল রাখতে সরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি না বাড়লে অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় গতি ফিরবে না। ফলে সরকারি বিনিয়োগ থেকে যে অবদান আশা করা হচ্ছে, তা-ও পূরণ হবে না,' বলেন তিনি।
পিছিয়ে আছে বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পগুলো
প্রথম প্রান্তিকের এই ধীরগতি দেশি-বিদেশি দুই ধরনের অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন ব্যয়কেই প্রভাবিত করেছে। তবে বৈদেশিক তহবিলের অর্থ ব্যবহারে ধস নেমেছে সবচেয়ে বেশি।
সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা বা ৪.২৮ শতাংশ ব্যয় করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বরাদ্দের ৪.৩৮ শতাংশ।
চলতি এডিপিতে সরকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এ খাত থেকে ব্যয় কমে ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ৩.১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এক বছর আগের একই সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ৫.৯০ শতাংশ।
এছাড়া সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে বছরজুড়ে ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫১৮ কোটি টাকা বা বরাদ্দে ৫.৮০ শতাংশ।
উন্নয়ন তহবিলের অর্থ ব্যয়ে হিমশিম খাচ্ছে বড় মন্ত্রণালয়গুলো
এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও বেশ ধীর। আইএমইডির তথ্যমতে, সম্মিলিতভাবে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মোট উন্নয়ন বাজেটের ৫২.৫০ শতাংশ বরাদ্দ পেলেও সেপ্টেম্বর শেষে তারা ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৬.৬২ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ এই প্রান্তিকে ব্যয় করেছে ৪ হাজার ১১১.৭৬ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৯ হাজার ৮৪১.৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করেছে মাত্র ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা বা প্রায় ৪ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ১০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যয় করেছে ১ হাজার ২৬০.৯৭ কোটি টাকা বা ৬.৯৬ শতাংশ।
তবে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাদ্দের প্রায় ১৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের হার ছিল ২ শতাংশ বা তারও নিচে। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ২.২৭ শতাংশ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ২.০৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১.৭৮ শতাংশ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১.৮৬ শতাংশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ২.০৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে।
এই বিভাগের অন্যান্য খবর