আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধে কত টাকা ঢাললো যুক্তরাষ্ট্র?

মুনা নিউজ ডেস্ক | ৩ মার্চ ২০২৬ ২১:০৬

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকর সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে গত শনিবার। এদিন ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ বিমান হামলায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানের অভ্যন্তরে অভিযানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন নিহত হন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন ‘এপিক ফিউরি’ নামের এ অভিযান ৪-৫ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। দীর্ঘ সময়ের কারণে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ কি যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে পারবে ওয়াশিংটন এবং এর মোট খরচ কত দাঁড়াতে পারে?

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটের আকার সামনে রেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো যুদ্ধ চালাতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অস্ত্রের মজুদ, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

অপারেশন এপিক ফিউরি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আট মিনিটের এক ভিডিওতে ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, ইরানের অভ্যন্তরে ‘বড় ধরনের যুদ্ধাভিযানে’ অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে পেন্টাগন জানায়, এ অভিযানের নাম অপারেশন এপিক ফিউরি।

ট্রাম্প বলেন, এ অভিযানের উদ্দেশ্য হলো ‘ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।’

তিনি বলেন, ‘তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব আমরা এবং ইরানের শিল্পটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানি ভূখণ্ডে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। আলাদা বিবৃতিতে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ১১টি জাহাজ ধ্বংসের দাবি করেছে।

এ অভিযানে বিমান হামলা, সমুদ্র থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক-সম্পর্কিত স্থাপনায় সমন্বিত আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে জড়িত শীর্ষ ব্যক্তিদেরও টার্গেট করা হয়।

গতকাল ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘যতদিন প্রয়োজন’ যুদ্ধ চলবে। সোমবার পর্যন্ত দেশের ১৩০টি স্থানে ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট।

সাম্প্রতিক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাবদ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ইয়েমেন, ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সমর্থনে পরিচালিত মার্কিন অভিযানে খরচ হয়েছে আরো ৯৬৫ থেকে ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলার।

গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত খরচ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৩৫ থেকে ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলার। খরচের এ অঙ্ক এখনো বাড়ছে।

অপারেশন এপিক ফিউরির অস্ত্রব্যবস্থা

সেন্টকমের তথ্যানুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরিতে আকাশ, সমুদ্র, স্থল ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিলিয়ে ২০টিরও বেশি অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোয় হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে বি-২ স্পিরিট। আরো ব্যবহার হচ্ছে এফ-৩৫ লাইটেনিং টু ও এফ-২২ র‌্যাপটরের মতো উন্নত স্টেলথ ফাইটার। এর মধ্যে ব্যাপক ব্যবহৃত এফ-১৫ জেটের তিনটি কুয়েতের আকাশে হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরো রয়েছে এফ-১৬, এফ/এ-১৮ সুপার হরনেট, এ-১০ জেট। ইলেকট্রনিক আক্রমণে ব্যবহৃত হয়েছে এফএ-১৮জি গ্রোলার এবং আকাশ থেকে নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ডে এডব্লিউএসিএস।

এবারই প্রথমবারের মতো ব্যবহার হচ্ছে লুকাস ড্রোন। দূরপাল্লার হামলায় আরো রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার, এম-১৪২ হিমার্স রকেট সিস্টেম ও টোমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার তালিকায় রয়েছে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর, থাড ও কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা। নৌপথে রয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বাধীন দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, মেরিটাইম প্যাট্রল পি-৮ পসেইডন, রিফুয়েলিং ট্যাংকার ও লজিস্টিকস সহায়তাদাতা সি-১৭ গ্লোবমাস্টার ও সি-১৩০ হারকিউলিস।

যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপারেশন এপিক ফিউরি মোট খরচ এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। তবে অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। ফাইটার জেটের পুনর্বিন্যাস, এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন ও আঞ্চলিক সামরিক সম্পদ সক্রিয়করণসহ অভিযানের আগে সামরিক প্রস্তুতি বাবদ যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে আরো ৬৩ কোটি ডলার।

সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির হিসাব অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ৬৫ লাখ ডলার।

অর্থাৎ যুদ্ধ কয়েক দিন গড়াতেই বিলিয়ন ডলার ইরান হামলায় খরচ করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

আর্থিক সক্ষমতা বনাম অস্ত্র মজুদ

স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট বর্তমানে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার। তা বাড়িয়ে সম্প্রতি দেড় লাখ কোটি ডলার করার প্রস্তাব দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ক্রিস্টোফার প্রেবলের মতে, খরচের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থান রয়েছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো অস্ত্রের মজুদ বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র কতটা রয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ইন্টারসেপ্টর অসীম পরিমাণে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বর্তমান হারে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ অভিযান কয়েক সপ্তাহের বেশি চালানো কঠিন হতে পারে। এসব ইন্টারসেপ্টরের একটি অংশ ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির এবং ‘প্রতিদিন শত শত বানানো হয় না।’



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: