জালিয়াতি তদন্তের জেরে কগনিজ্যান্টের স্থায়ী শ্রম সনদ আবেদন স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

মুনা নিউজ ডেস্ক | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৫৯

ছবি: গ্রাফিক্স ছবি: গ্রাফিক্স
ভারতীয় তথ্য-প্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠান কগনিজ্যান্টের স্থায়ী শ্রম সনদ বা ‘পার্ম’ আবেদন স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ। বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ ও বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় পার্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
 
ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি ভিসা ও বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কথিত জালিয়াতির বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার করার মধ্যেই কগনিজ্যান্টের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাইয়ে শুরু হওয়া দেশব্যাপী জালিয়াতির তদন্তের অংশ হিসেবে কগনিজ্যান্টের পার্ম আবেদন স্থগিত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়ার সময় শ্রম বিভাগের এক কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘হাতকড়ি অপেক্ষা করছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শক অ্যান্থনি ডি’এসপোসিতো মঙ্গলবার জানান, কগনিজ্যান্ট ও ক্লাউডেরার পার্ম আবেদন স্থগিত করা হয়েছে।
 
হোয়াইট হাউসের জালিয়াতিবিরোধী টাস্কফোর্স এবং সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত চালানোর পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
 
ডি’এসপোসিতো বলেন, ‘আমেরিকান কর্মীদের জন্য হুমকি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।’ তিনি আরো বলেন, জালিয়াতির বিরুদ্ধে লড়াই একটি দলগত কাজ। এ বিষয়ে শ্রম বিভাগের কর্মকর্তারা একসঙ্গে কাজ করছেন।
 
কগনিজ্যান্টের পার্ম আবেদন স্থগিত করা হয়েছে এবং এখন মহাপরিদর্শকের কার্যালয় তদন্ত চালাচ্ছে। এ সময় তিনি শ্রম বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব কিথ সন্ডারলিংয়ের কথাও উল্লেখ করেন। ডি’এসপোসিতো বলেন, হোয়াইট হাউসের জালিয়াতিবিরোধী টাস্কফোর্সের সঙ্গে মিলে তারা তথ্য, জালিয়াতির প্রমাণ এবং অর্থের গতিপথ অনুসরণ করছেন। শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশের কারণে কগনিজ্যান্ট নতুন করে কোনো পার্ম আবেদন করতে পারবে না। এইচ-১বি ও পার্ম কর্মসূচিতে কথিত জালিয়াতির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
 
পার্মের পুরো নাম ‘প্রোগ্রাম ইলেকট্রনিক রিভিউ ম্যানেজমেন্ট’। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো নিয়োগকর্তা বিদেশি কর্মীকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে চাইলে সাধারণত এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পার্ম অনুমোদনের জন্য নিয়োগকর্তাকে দেখাতে হয়, ওই পদের জন্য উপযুক্ত ও সহজলভ্য কোনো মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের বেতন বা কাজের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। পার্ম অনুমোদন পাওয়ার পর বিদেশি কর্মীর স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। কগনিজ্যান্ট যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার অন্যতম বড় পৃষ্ঠপোষক। প্রতিষ্ঠানটি তথ্য-প্রযুক্তি ও প্রযুক্তি সেবা খাতে কাজ করে।
 
কগনিজ্যান্ট ১৯৯৪ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির টিনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা বা ইউএসসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত কগনিজ্যান্টের ৩ হাজার ৫১০টি এইচ-১বি ভিসার আবেদন অনুমোদিত হয়েছে। তবে কয়েক বছর আগের তুলনায় এই সংখ্যা কমেছে। ২০২০ সালে কগনিজ্যান্টের অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৪১৩। এইচ-১বি ভিসা মূলত উচ্চ দক্ষতার বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ দেয়। প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই ভিসার মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে। কগনিজ্যান্টের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের কারণে ভারতের বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নজরদারি বাড়তে পারে। 
 
টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), ইনফোসিস, উইপ্রো ও এইচসিএলের মতো প্রতিষ্ঠানও যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসা ও পার্ম প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত আরও বিস্তৃত হলে এসব প্রতিষ্ঠানও বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে পারে। কগনিজ্যান্টের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি মামলাও চলছে। ওই মামলায় একটি ফেডারেল জুরি প্রতিষ্ঠানটিকে ভারতীয় নন- এমন কর্মীদের সঙ্গে বৈষম্য করার জন্য দায়ী করেছে। এই ঘটনার পাশাপাশি পার্ম ও এইচ-১বি ভিসা নিয়ে নতুন তদন্ত কগনিজ্যান্টের ওপর সরকারি নজরদারি আরো বাড়িয়েছে। তবে পার্ম আবেদন স্থগিত করার অর্থ এই নয় যে কগনিজ্যান্টের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন।
 
ট্রাম্প প্রশাসন জুলাইয়ে এইচ-১বি ও পার্মসহ বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কথিত জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে দেশব্যাপী তদন্ত শুরু করে। সরকারের অভিযোগের মূল বিষয় হলো, কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার প্রক্রিয়ায় নিয়মের অপব্যবহার করে থাকতে পারে। এই তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আবেদন, তথ্য ও অর্থের লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কগনিজ্যান্টের পার্ম আবেদন স্থগিত করা সেই তদন্তে এখন পর্যন্ত নেওয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর একটি। একই তদন্তে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্লাউডেরাও নজরদারির আওতায় এসেছে। শ্রম বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্ম আবেদন প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকতে পারে।