ফাইল ছবি
টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২০০ বছর পর কোনও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। ৩০ বছর আগে হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত ক্রিস্টা পাইকের ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর বিল লি। ফলে সবকিছু নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে স্থানীয় সময় বুধবার পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
৫০ বছর বয়সী পাইক ১৯৯৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সময় ১৮ বছরের তরুণী ছিলেন। তার তৎকালীন ১৭ বছর বয়সী প্রেমিকের সঙ্গে মিলে সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যার অভিযোগে পরের বছর তাকে প্রথম-ডিগ্রি হত্যায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা, জড়িতদের বয়স এবং নিহতের শরীরে শয়তানবাদের একটি প্রতীক খোদাই করার ঘটনা মামলাটিকে ব্যাপকভাবে আলোচিত করে তোলে।
পাইকের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তার আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, শৈশব থেকেই তিনি নির্যাতনের শিকার ছিলেন এবং গুরুতর মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তার আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ছোটবেলা থেকেই নির্যাতনের শিকার হন এবং ১১ ও ১৭ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হন।
পরে পাইকের বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) শনাক্ত হয়।
তার আইনজীবীদের দাবি, ১৯৯৬ সালের বিচারের সাজা নির্ধারণের পর্যায়ে জুরির সামনে পাইকের অতীতের এসব তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে ওই অপরাধ সংঘটনের সময় তার বয়স মাত্র ১৮ বছর ছিল- এ বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
পাইকের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, শৈশবজুড়ে যেসব মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তার যত্ন ও কার্যকর হস্তক্ষেপ পাওয়ার কথা ছিল, তারা তাকে ব্যর্থ করেছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী সেই তরুণী এখন আর আগের অবস্থায় নেই। বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী পাইক নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত, নিজের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কারাগারে থাকা অন্য নারীদের সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
মৃত্যুদণ্ড স্থগিত বা ক্ষমার আবেদন নিয়ে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোও সরব হয়েছিল। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংগঠন টেনেসির গভর্নরের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পাইকের মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়।
তবে গভর্নর বিল লি তার ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এক বিবৃতিতে লি বলেন, পাইকের ক্ষমার আবেদন এবং মামলাটি তিনি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন। এরপর টেনেসি অঙ্গরাজ্যের দেওয়া সাজা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এতে হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনা তার নেই।
গভর্নরের সিদ্ধান্তের পর পাইকের আইনজীবীরা বলেন, তারা এতে ‘গভীরভাবে দুঃখিত ও মর্মাহত’। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ১৮ বছর বয়সী একজন তরুণী- বিশেষ করে গুরুতর মানসিক আঘাতের শিকার একজন ব্যক্তির অপরাধের জন্য কতটা দায় বহন করা উচিত, সে বিষয়ে গত কয়েক দশকের গবেষণাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
পাইকের আইনজীবীরা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের কাছেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার আবেদন জানিয়েছেন।
পাইকে কখনওই স্লেমার হত্যায় নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেননি। তবে ক্ষমার আবেদনে তিনি নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন।
পাইকের ভাষ্য, তিনি তখন মানসিকভাবে অসুস্থ ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী ছিলেন। নিজের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা বুঝতে তার বহু বছর সময় লেগেছে। একই সঙ্গে ওই হত্যাকাণ্ডের কারণে কত মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়েছে, সেটিও উপলব্ধি করতে আরও সময় লেগেছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, তিনি এমন একজন মানুষের জীবন নিয়েছেন, যিনি কারও সন্তান, কারও বোন ও কারও বন্ধু ছিলেন। এখন সেই অপরাধ করার সক্ষমতা নিজের মধ্যে ছিল- এ কথা ভাবলেই তিনি অসুস্থ বোধ করেন বলেও উল্লেখ করেন।
পাইকের আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল বলেন, বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা সম্পর্কে আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা গেছে। তার মতে, পাইকের মৃত্যুদণ্ড সেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
হত্যাকাণ্ডের সময় পাইকের প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের বয়স ছিল ১৭ বছর। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও বয়সের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে প্যারোলের সুযোগ রাখা হয়েছিল। গত বছর তার প্যারোলের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত আরেক কিশোর সহযোগী হিসেবে নিজের ভূমিকা স্বীকার করেছিল এবং তাকে পরীক্ষামূলক মুক্তির সাজা দেওয়া হয়।
নিহত কোলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, তার মেয়ে স্পেশাল অলিম্পিকসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতেন, রোলার স্কেটিং ভালোবাসতেন এবং কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন।
মার্টিনেজের ভাষ্য, তার মেয়ে ছিলেন শান্ত স্বভাবের এবং কম্পিউটারের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। বাবার সঙ্গে মিলে তারা নিয়মিত কম্পিউটার তৈরি ও খুলে দেখতেন। তিনি সবাইকে বিশ্বাস করতেন- আর সেটিই শেষ পর্যন্ত তার জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করেন তার মা।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, টেনেসিতে সর্বশেষ কোনও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৮২০ সালে। মার্টিন ইভ নামের এক নারীকে হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে প্রায় দুই শতাব্দী পর টেনেসিতে আবার কোনও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০২৩ সালে মিসৌরিতে ২০০৩ সালের একটি হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত অ্যাম্বার ম্যাকলাফলিনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাকে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার লিসা মন্টগোমেরির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। প্রায় সাত দশকের মধ্যে সেটিই ছিল ফেডারেল সরকারের কোনও নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা। ২০১৫ সালে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যেও একজন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
এখন টেনেসিতে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় কি না, তা নির্ভর করছে তার আইনজীবীদের করা শেষ মুহূর্তের আইনি আবেদনের ওপর।