ফাইল ছবি
কংগ্রেসের সদস্য ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির বাসায় তল্লাশি চালিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।
সোমবার সকালে একটি চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এ তল্লাশি চালানো হয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। তবে তদন্তের সুনির্দিষ্ট বিষয় এবং তল্লাশির পর কী পাওয়া গেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান, বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই) বিচার বিভাগের অনুমোদন নিয়ে আদালতের জারি করা তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করেছে। এটি একটি চলমান কেন্দ্রীয় তদন্তের অংশ।
ফক্স নিউজের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এইচএসআই লেখা জ্যাকেট পরা কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইলহান ওমরের বাসভবন বলে চিহ্নিত একটি স্থানে দেখা যায়।
তল্লাশির বিষয়ে ইলহান ওমরের কার্যালয়, বিচার বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ও হোয়াইট হাউসের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কেউ সাড়া দেয়নি।
শৈশবের অভিবাসন নথি নিয়ে তদন্ত
ফক্স নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তদন্তকারীরা ইলহান ওমরের বাবা তার শৈশবে যে অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র পূরণ করেছিলেন, সেগুলো পরীক্ষা করছেন। তবে তদন্তের প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ইলহান ওমরের পরিবারের অভিবাসন ইতিহাস নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ করে আসছেন। এমনকি তার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বাতিল এবং তাকে দেশ থেকে বহিষ্কারের কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন ট্রাম্প। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইলহান ওমর বরাবরই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছেন। তিনি ২০১৯ সালে কংগ্রেসে যোগ দেন। একই বছর রাশিদা তালিবের সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন হন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর তদন্ত নিয়ে আলোচনা
ইলহান ওমরকে তদন্তের আওতায় আনার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন। শনিবার এক নির্বাচনী সমাবেশে ইলহান ওমরকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসনের লোকজন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন। এ সময় তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কথাও উল্লেখ করেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, ইলহান ওমর তার ভাইকে বিয়ে করেছিলেন। তার দাবি, ওই বিয়ের উদ্দেশ্য ছিল সাবেক স্বামীকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ করে দেওয়া। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
এর কয়েক দিন পর ট্রাম্পের সীমান্তবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা টম হোম্যান বলেন, ইলহান ওমরকে ঘিরে নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, অভিবাসনসংক্রান্ত সম্ভাব্য জালিয়াতির বিষয়টি এইচএসআইয়ের একজন তদন্তকারী খতিয়ে দেখবেন।
গত মার্চে ভ্যান্স ডানপন্থী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বেনি জনসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাদের ধারণা ইলহান ওমর অভিবাসন জালিয়াতি করেছেন। এ বিষয়ে ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারের সঙ্গে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলার কথাও জানান তিনি।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিনও বলেন, ইলহান ওমরকে নিয়ে তদন্ত চলছে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি হোম্যান। তিনি বলেন, চলমান ফৌজদারি তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়; এইচএসআইকে তদন্ত চালিয়ে যেতে দেওয়া উচিত।
সাবেক স্বামীকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগ
ইলহান ওমরকে নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বিষয় তার সাবেক স্বামী আহমেদ নুর সাইদ এলমিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ। ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের দাবি, এলমি আসলে ইলহান ওমরের ভাই এবং তাকে অভিবাসনের সুবিধা দিতে বিয়ের নাটক করা হয়েছিল। ইলহান ওমর এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইলহান ওমর ও এলমির বিচ্ছেদ হয় ধর্মীয় রীতিতে কয়েক বছর আগে। পরে ২০১৭ সালে তাদের আইনি বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিয়ের মাধ্যমে অভিবাসন জালিয়াতি গুরুতর অপরাধ হলেও এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচ বছরের তামাদি মেয়াদ রয়েছে।
গত মাসে নিউইয়র্ক পোস্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ অভিবাসন কর্মকর্তার বরাতে জানায়, ইলহান ওমর বা তার বাবা অভিবাসন আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলে পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশাসন তার নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। ইলহান ওমরের বয়স এবং তার বাবার পেশাগত পরিচয় নিয়েও ওই প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ইলহান ওমরের বাসায় তল্লাশির ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারি ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ আরও জোরালো হতে পারে। ট্রাম্পের সমালোচকদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের অভিযোগ তার দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার সামনে এসেছে।
সোমবারের তল্লাশি সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তবে তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর হওয়া মানেই ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তের ফলাফল এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ওপরই বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে।
সোমালি-আমেরিকানদের নিয়েও ট্রাম্পের আক্রমণ
যুক্তরাষ্ট্রে সোমালি বংশোদ্ভূত সবচেয়ে পরিচিত রাজনীতিকদের একজন ইলহান ওমর। তাকে ঘিরে ট্রাম্পের বক্তব্যের পাশাপাশি সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে তার মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
শনিবারের সমাবেশে ট্রাম্প সোমালিয়াকে অপরাধ ও দুর্দশায় পূর্ণ দেশ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ইলহান ওমরের জন্য নয়। এর দুই দিন আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, মিনেসোটা সোমালি অভিবাসীদের দখলে চলে যাচ্ছে। অথচ ওই অঙ্গরাজ্যের সোমালি-আমেরিকানদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
গত ডিসেম্বরে সোমালি বংশোদ্ভূতদের ‘আবর্জনা’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি তাদের নিজেদের দেশে ফিরে যেতে বলেছিলেন।
এসব বক্তব্যের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মনোভাব উসকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এখন ইলহান ওমরের বাসায় তল্লাশির ঘটনায় অভিবাসন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে তদন্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।