বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণের তালিকায় শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম

২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৫৪

ফাইল ছবি ফাইল ছবি
বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের পাহাড় ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই বিশ্বজুড়ে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক ঋণ এখন ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ঋণের পরিমাণে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম।
 
বিপুল ঋণের পাশাপাশি বাড়ছে সুদ পরিশোধের চাপও। এর প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন দেশের সরকারি ব্যয়ে। ঋণের সুদ মেটাতে অর্থের বড় অংশ চলে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
 
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থের ঘাটতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে এসব ইস্যুতে বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
 
ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ ইউরোপের অর্থনীতির পাশাপাশি সরকারগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ নিয়ে ব্যয় চালানোর পর এখন অনেক দেশকে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বাড়তি অর্থ জোগাড় করতে হচ্ছে। ফ্রান্সে ঋণ নেয়ার ব্যয় ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
 
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বৈশ্বিক ঋণের আকার, সরকারগুলোর অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ তুলে ধরা হয়েছে।
 
সরকারি ঋণের মোট পরিমাণের হিসাবে বিশ্বে সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশের সমান।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেয়ার সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ সুবিধা দেয়। দেশটির সরকারি বন্ডের প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চাহিদাও রয়েছে। তবে এ সুবিধা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেয়ার সক্ষমতা যে সীমাহীন, তা নয়।
 
তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে চীন। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ।
 
তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি—১৯৯ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ।
 
এ ছাড়া ইতালির সরকারি ঋণ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানির সরকারি ঋণ ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও দেশটির জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশের সমান।
 
এদিকে বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে এই পরিমাণ ছিল ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেড় দশকে দেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
 
তবে ঋণের মোট পরিমাণের পাশাপাশি অর্থনীতির আকারের সঙ্গে তার তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ। এই হিসাবে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৪০ শতাংশ, যা তালিকার অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশের তুলনায় কম।
 
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য মূলত বন্ড ইস্যু করে। বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ড কিনে সরকারকে অর্থ দেন। বিনিময়ে সরকার নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধ এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
 
উদাহরণ হিসেবে, কোনো বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিয়ে ১০ বছর মেয়াদি একটি সরকারি বন্ড কিনলেন। বন্ডটির বার্ষিক সুদের হার ৫ শতাংশ হলে তিনি প্রতি বছর ৫ ইউরো করে সুদ পাবেন। ১০ বছরে সুদের পরিমাণ হবে মোট ৫০ ইউরো। মেয়াদ শেষে তিনি মূল ১০০ ইউরোও ফেরত পাবেন।
 
সরকারকে বেশি সুদ দিয়ে ঋণ নিতে হলে বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। ঋণের সুদ পরিশোধে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে গিয়ে সরকারকে অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হতে পারে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, অবকাঠামো কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
 
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে এই চাপ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ইউরোজোনে দেশটি ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। তুলনায় জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩.৪১ শতাংশ। এমনকি ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও ফ্রান্সের ঋণ নেয়ার খরচ বেশি। ইউরোজোনের বাইরে যুক্তরাজ্য বর্তমানে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে।
 
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বৈশ্বিক ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। এর ফলে মোট ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে সরকার, ব্যক্তি ও করপোরেট খাতের ঋণ অন্তর্ভুক্ত। মাথাপিছু হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।
 
ঋণের এই বিশাল বোঝার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সুদ পরিশোধের ব্যয়। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে।
 
ব্যয়ের এই পরিমাণ সামরিক খাতে বৈশ্বিক ব্যয়—৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার—এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যয় হওয়া ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের তুলনায়ও ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় অনেক বড়।
 
এত বিপুল অর্থ সুদ হিসেবে চলে যাওয়ায় সরকারগুলোর উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মসূচিতে অর্থ জোগানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো সরকারকে কর বাড়াতে হতে পারে, আবার কোনো সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর পথ বেছে নিতে হতে পারে।
 
বিশ্বজুড়ে ঋণের এই চিত্র দেখাচ্ছে, ঋণ নেয়া শুধু অর্থ সংগ্রহের বিষয় নয়; তা পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সুদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তার চাপ শেষ পর্যন্ত সরকারি বাজেট থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।