সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে তেহরানের ঝোঁক বাড়ায় তীব্র হচ্ছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১১ জুন ২০২৬ ২০:১৭

ছবি: গ্রাফিক্স ছবি: গ্রাফিক্স

চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে ইরান। এটি ছিল তাদের কয়েক দশকের সংঘাতের সীমানা নতুন করে নির্ধারণের সবচেয়ে বড় ও সাহসী প্রচেষ্টা। এতদিন দুই দেশের লড়াই মূলত ছায়া যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তারা লিপ্ত ছিল গোপন অভিযান ও মেপে মেপে প্রতিশোধ নেওয়ার খেলায়। তবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে তেহরান এবার সরাসরি আক্রমণ চালাল।

এর মাধ্যমে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা আর কেবল নিজেদের সীমান্তের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির নতুন প্রজন্মের নেতারা এখন অনেক বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেই তেহরান অভিযোগ করে আসছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি লঙ্ঘন করছে। পরোক্ষ আলোচনা চলা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের ও পারস্য উপসাগরীয় লক্ষ্যবস্তুগুলোয় হিসাবনিকাশ করে পাল্টা হামলা চালায়। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে তারা পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলে সরাসরি হামলা চালিয়ে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ইসরায়েলি হামলা হলেও ইরান এখন সরাসরি জবাব দেবে। মূলত একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর অচলাবস্থা ভাঙা এবং হিজবুল্লাহকে সমর্থন জোগানোই ছিল এই হামলার মূল উদ্দেশ্য।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার বলেন, কাগজে-কলমে থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বাস্তবে বারবার লঙ্ঘন করা হচ্ছিল। আমরা সেই সমীকরণটি উল্টে দিয়েছি। যতক্ষণ না বিশ্বাস গঠনের সত্যিকারের সদিচ্ছা দেখা যাবে, ইরানের প্রতিক্রিয়া এমনই থাকবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তারা কোনো অবস্থাতেই একপক্ষীয় চুক্তি মেনে নেবেন না। যেখানে যুদ্ধবিরতির নামে ইরানকে শান্ত থাকতে বলা হবে আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের হামলা চালিয়ে যাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি তেহরানের একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন। ইরানের নতুন প্রজন্মের নেতারা তাদের পূর্বসূরিদের মতো সাবধানে প্রতিক্রিয়া দেখানোর নীতি থেকে সরে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে তারা এখন সামরিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে বড় ঝুঁকি নিতেও দ্বিধাবোধ করছেন না।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। এর জবাবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির অধীনে ইরান বেশ সাবধানে ইরাকের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হামলাটি এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে সেনারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় পায়।

২০২৫ সালের জুনে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, তখনও তেহরান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমানুপাতিক ও পরিমিত জবাব দিয়েছিল। তবে বর্তমানে দেশটির নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো আঞ্চলিক শক্তি ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার সক্ষমতা ও সাহস দেখাল।

ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, একটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েল ও আমেরিকানরা যদি মনে করে ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ তৈরি করে তারা ইরান ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাত বেঁধে রাখতে পারবে, তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনা নতুন এক প্রমাণ সামনে এনেছে। ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, যা কূটনীতির মাধ্যমে অর্জন করা যায় না, তা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করা সম্ভব।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: