হরমুজ প্রণালী সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২১ আগস্ট ২০২৬ ০১:৫৯

ছবি: গ্রাফিক্স ছবি: গ্রাফিক্স
হরমুজ প্রণালি সংকট ঘিরে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করে আছেন যুদ্ধ শেষ হবে এবং সংকটের সমাধান হবে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসবে।
 
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের সরবরাহ কমে আসছে।
 
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একদিকে কৃষি খাতের চাহিদা, অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় ডিজেলের দাম বেড়েই চলেছে। ডিজেল ক্র্যাক স্প্রেড অর্থাৎ এক ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এবং তা থেকে পরিশোধিত ডিজেলের দামের পার্থক্য এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয় স্থানেই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
 
অপরিশোধিত তেলের বাজার মূলত নিকট ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা প্রকাশ করে।
 
কিন্তু ডিজেলের বাজার জ্বালানি পণ্যটির বাস্তব সরবরাহ সংকটের স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে। এ বছর এখনো ডিজেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি অথচ এর প্রাপ্যতা ও দাম অর্থনীতি এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
 
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল ক্র্যাক স্প্রেড প্রথমবারের মতো তিন অঙ্কে পৌঁছেছে। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ ডিজেলের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
 
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময় অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সুরক্ষিত রাখতে কয়েক মাস ধরে বিধি-নিষেধের পর চীনের জ্বালানি রপ্তানি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায়নি। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিও বেশির ভাগ সময় বন্ধ রয়েছে।
 
মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও চীন থেকে হারিয়ে যাওয়া ডিজেল সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শোধনাগারগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় উত্পাদন চালাচ্ছে। তবে এতে স্বস্তি আংশিকই এসেছে।
 
কারণ বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যম-ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বছরের এই সময় পাঁচ বছরের গড় তুলনায় মজুদ এখন ১২ শতাংশ কম।
রেকর্ড পরিশোধন মুনাফার কারণে অনেক শোধনাগার সরবরাহ বাড়ানোর জন্য নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণও পিছিয়ে দিচ্ছে এবং প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ চলছে। এতে ডিজেলের বাজারে কোনো একটি বড় বাধা বা অপ্রত্যাশিত উত্পাদন বন্ধ হয়ে গেলে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় দাম ওঠার ঝুঁকি আরো বেড়ে যাবে।
 
জ্বালানি প্রবাহ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক রোহিত রাঠোড বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে শোধনাগারগুলোর মুনাফা প্রায় রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে, যার প্রধান কারণ গুরুতর এবং ক্রমে অবনতিশীল ডিজেল ঘাটতি।’
 
ইউক্রেনের ড্রোন হামলার পর রাশিয়ার শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পরিবহন সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে এই দুই অঞ্চল থেকে ডিজেলের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ভরটেক্সার তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে  মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল ও গ্যাস অয়েল রপ্তানি ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মাত্র ১৬ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
 
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মজুদ কমে যাওয়া এবং বাড়তে থাকা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বৈশ্বিক ডিজেল বাজার অত্যন্ত সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর পরিণতিতে দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম এক মাসে ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং এক বছর আগের গড় দাম ৩.৬৯ ডলারের তুলনায় ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। 
 
আগামী কয়েক সপ্তাহে ডিজেলের চাহিদা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক দেশেই কৃষকরা ফসল কাটার প্রস্তুতি নেবেন, ট্রাকচালকরা ছুটির মৌসুমের আগে দোকানগুলোতে পণ্য মজুদ করার জন্য বেশি পণ্য পরিবহন করবেন এবং শীতকালে গরমের জ্বালানি হিসেবে  দেশগুলোতে গ্যাসঅয়েল কিনবে।
 
উচ্চ দামের কারণে পেট্রলের চাহিদায় কিছুটা পতন দেখা যেতে পারে, কিন্তু ডিজেলের চাহিদা সহজে কমবে না। অর্থাৎ দাম বাড়লেও এর ব্যবহার সহজে কমানো যায় না। এনার্জি এসপেক্টের রবার্ট ক্যাম্পবেল ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘ডিজেল শিল্প অর্থনীতির প্রাণ, এটিকে হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া যায় না।’
 
অর্থনীতির জন্য এই জ্বালানি অপরিহার্য। ফলে সামনে ডিজেলের দাম আরো বাড়তে পারে, যা পণ্যের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের শুরুর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোক্তাদের (ভোটারদের) পকেটে আরো চাপ সৃষ্টি করবে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: