বিশকেকে এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে একত্রিত হতে যাচ্ছেন পুতিন, শি, পেজেশকিয়ান, মোদি ও শাহবাজ

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২৯ আগস্ট ২০২৬ ১৭:২৮

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সোমবার শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলন। এতে অংশ নিতে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সম্মেলনে ইরান, ভারত ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারাও অংশ নেবেন।

আঞ্চলিক এই জোটের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে প্রায় এক ডজন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবের বিপরীতে বহুমুখী বা বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসসিওকে গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া ও চীন।

এসসিওতে রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মধ্য এশিয়ার চার দেশ এবং মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ সদস্য হিসেবে রয়েছে।

সম্মেলনে থাকছেন পুতিন, শি ও পেজেশকিয়ান

সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের সভাপতিত্বে অংশ নেবেন রাশিয়ার পুতিন, চীনের শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এছাড়া অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গেও রুশ প্রেসিডেন্টের বৈঠক হতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে রাশিয়া ও ইরান সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনকে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈঠক

এসসিও সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর প্রায় সাড়ে চার বছর পেরিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধও ছয় মাসে গড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে পুতিন ও পেজেশকিয়ানের বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের বৈঠকের কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ বিরল এক সফরে মস্কো যান।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো ধারণা করেছে, র‍্যাটক্লিফের ওই সফরে ইউক্রেন ও ইরান পরিস্থিতি নিয়ে তার রুশ সমকক্ষদের সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।

পশ্চিমবিরোধী বার্তার মঞ্চ এসসিও?

প্রতিষ্ঠার সময় এসসিওর মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও বেইজিংয়ের নেতৃত্বে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এসসিওর প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণায় বলা হয়েছে, এটি ‘অন্য কোনও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত জোট নয়’। কিন্তু সংগঠনটির সম্মেলনে পুতিন ও শি একাধিকবার পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।

গত বছরের সম্মেলনে পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোকে ইউক্রেন যুদ্ধ উসকে দেওয়ার জন্য দায়ী করেন। একই সম্মেলনে শি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে ‘ভয় দেখানোর কর্মকাণ্ডের’ সমালোচনা করেন।

ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবিরোধী সামরিক জোট না হলেও এসসিওকে পশ্চিমা প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায় একটি সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

সদস্যদেশগুলোর কেউ যুদ্ধে, কেউ বাণিজ্যযুদ্ধে

বিশকেকের এবারের সম্মেলন এমন সময়ে হচ্ছে, যখন এসসিওর কয়েকটি সদস্য দেশ সরাসরি যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পাশাপাশি চীন ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক উত্তেজনাও রয়েছে।

চীনা ও ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের ফলে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এমন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্বর্ণ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সম্পদ, বিমান চলাচল এবং সামুদ্রিক পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতকে এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরানের ওপর এমন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা, যাতে দেশটির সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ইরানের মিত্রদেরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীন ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা। ফলে চীনের বিরুদ্ধে পরোক্ষ চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। বেইজিং এর জবাবে জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থ ‘দৃঢ়ভাবে রক্ষা’ করবে।

নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এসসিওর ওপর ভরসা তেহরানের

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে আমেরিকান ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, অর্থনৈতিক চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন, দেশটি বর্তমানে ‘অর্থনৈতিক সংকটের’ মুখোমুখি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হাসান নাজমি বলেন, তেহরান মনে করে, এসসিওসহ বিভিন্ন জোটে সদস্যপদ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইরান ২০২৩ সালে এসসিওর পূর্ণ সদস্য হয়। তবে নাজমির মতে, সংগঠনটির বাস্তব সুফল নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ সংকটের সময় এ ধরনের জোট অতীতে ইরানের সমস্যাগুলো সমাধানে খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবি

এসসিওর সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২৫ শতাংশ তাদের দখলে।

তবে বিশাল এই জোটের সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও রয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর কৌশলগত মূল্যও অনেক।

এছাড়া চীনের সঙ্গে ভারতের এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধ রয়েছে। ফলে এসসিওকে একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে পরিচালনা করা সবসময় সহজ নয়।

পশ্চিমের বিকল্প শক্তি, নাকি স্বার্থের সমন্বয়ের মঞ্চ?

বিশকেক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রাশিয়া ও চীন আবারও বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের জন্য সম্মেলনটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধ, স্বার্থের ভিন্নতা এবং এসসিওর কোনও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না হওয়ার কারণে সংগঠনটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার সরাসরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তারপরও ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে পুতিন, শি, পেজেশকিয়ান, মোদি ও শেহবাজের একই মঞ্চে উপস্থিতি এবারের এসসিও সম্মেলনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।