ছবি: গ্রাফিক্স
রেকর্ড-ভাঙার মতো শক্তিশালী এক ‘এল নিনো’ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ, খরা, বন্যা, ফসলহানি এবং মানবিক সংকটের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এবং ১৯৫০ সালে তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে এটি অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মধ্য ও পূর্ব গ্রীষ্মম-লীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ২০১৫-১৬ সালে রেকর্ড করা ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগের সর্বোচ্চ মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
একটি ‘সুপার এল নিনো’ বৈশ্বিক পরিসরে বায়ুম-লের সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিতে পারে; এর ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচ- তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে, আবার কোথাও বৃষ্টিপাতের অভাবে খরা দেখা দিতে পারে কিংবা অন্য কোনো অঞ্চল ধ্বংসাত্মক বন্যার কবলে পড়তে পারে। এর প্রভাব দ্রুত জলবায়ু ব্যবস্থা থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে কৃষি খামার, খাদ্য বাজার, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে। খরায় ফসল ও গবাদিপশু ধ্বংস হতে পারে; অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ফসল ও ঘরবাড়ি ভেসে যেতে পারে; চরম তাপে পানিশূন্যতা, সংক্রামক রোগ এবং তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এছাড়া বাস্তুচ্যুতি, বারবার দুর্যোগের আঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক আঘাত (ট্রমা) ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট আরও গভীর করতে পারে।এই পরিস্থিতির আঘাত শিশু এবং আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ করে মারাত্মক হতে পারে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ১শ’ দেশের ৩৪ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি শিশুর স্বাস্থ্য অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বা চরম শুষ্ক আবহাওয়ার কবলে পড়তে পারে।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই চরম আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লাখ ৫১ হাজারে পৌঁছাতে পারে। বিভিন্ন মহাদেশ ভেদে এর মাত্রা বমবেশি হবে।এশিয়া: ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে, যা ফসল ও পানি সরবরাহের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া খরা ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে; অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান; এর মধ্যে বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।
আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকায় তীব্র খরার ঝুঁকি ভুট্টা, গবাদিপশু ও খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলছে। অন্যদিকে, ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’তে (আফ্রিকার শিং আকৃতির অঞ্চল) অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। সোমালিয়া, কেনিয়া ও ইথিওপিয়ায় ফসলহানি, বাস্তুচ্যুতি, রোগব্যাধি ও অপুষ্টির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মধ্য আফ্রিকা, সুদান, দক্ষিণ সুদান ও শাদ বিশেষভাবে উচ্চ মানবিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউরোপ: অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল, কৃষিজ ক্ষতি এবং পানির সংকটকে তীব্র করে তুলতে পারে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াবে।উত্তর আমেরিকা: ৪৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের দক্ষিণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে চরম তাপ তাপজনিত অসুস্থতা, ফসলহানি, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং মানসিক চাপের মতো সমস্যাগুলো আরও প্রকট হতে পারে।ও মানসিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকা: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক আবহাওয়া কৃষি ও পানি সরবরাহের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে; অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অধিক বৃষ্টিপাতপ্রবণ এলাকাগুলো বন্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ওশেনিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিছু অংশ তীব্র তাপ, খরা ও পানি সংকটের সম্মুখীন। এর ফলে খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুতি ও মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়ছে।