উইঘুরদের প্রতি চীনের আচরণের বিষয়ে আরও জোরালো আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানাল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

মুনা নিউজ ডেস্ক | ৩০ আগস্ট ২০২৬ ১৯:০৭

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের ওপর গত এক দশক ধরে চলা ব্যাপক দমনপীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ১০ বছর আগে শিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন ব্যাপকভাবে বাড়ালেও এখনো পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং গণহারে নির্বিচার আটক, অন্যায্য কারাদণ্ড, ব্যাপক নজরদারি, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা, ভ্রমণ ও যোগাযোগে কঠোর বিধিনিষেধ এবং বিদেশে বসবাসরত উইঘুরদের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।

একই সময়ে চীনা কর্তৃপক্ষ শিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে আন্তর্জাতিকভাবে একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউর চীনবিষয়ক গবেষক ইয়ালকুন উলুইওল বলেন, শিনজিয়াংয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ করা এবং যেসব উইঘুরের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে চীনা সরকার এখনো দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিদেশেও সমালোচকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুরুতে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া থাকলেও তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে চীনা সরকার অঞ্চলটিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতির একটি ভুয়া ধারণা প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছে।

শিনজিয়াংয়ে দমনপীড়ন ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে ২০১৪ সালে, যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সহিংস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট শিনজিয়াংয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে চেন ছুয়ানগুও নিয়োগ পাওয়ার পর এই অভিযান আরও তীব্র হয়।

একপর্যায়ে প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে তথাকথিত রাজনৈতিক শিক্ষা শিবিরে নির্বিচারভাবে আটক করা হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এরপর এসব শিবিরের কিছু বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হলেও সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে এখনো কয়েক লাখ উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম কারাগারে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে উইঘুর অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ ইলহাম তোহতি, গবেষক রহিলে দাওয়ুত, গুলশান আব্বাস, ইয়ালকুন রোজি ও একপার আসাতের মতো পরিচিত ব্যক্তিও রয়েছেন।

চলতি বছরের মে মাসে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, জনসংখ্যার তুলনায় কারাগারে আটক রাখার সক্ষমতার দিক থেকে শিনজিয়াং বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংগঠন শিনজিয়াং ভিকটিমস ডেটাবেসের চলতি বছরের জুলাইয়ের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দক্ষিণ শিনজিয়াংয়ে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। এর বড় কারণ ছিল বাবা-মায়ের নির্বিচার আটক।

এই শিশুদের একটি অংশকে রাষ্ট্র পরিচালিত এতিমখানায় রাখা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব শিশুর পরিস্থিতি কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিদেশে বসবাসরত অনেক উইঘুরও চীনে থাকা তাদের পরিবারের সদস্য, এমনকি সন্তানদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন না। উইঘুরদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

তবে বেছে বেছে প্রবাসী কিছু উইঘুরকে শিনজিয়াং সফরের সুযোগ দেওয়া হয়। দেশে ফিরে আসা কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, বিদেশে থাকা উইঘুর অধিকারকর্মীদের বিষয়ে তথ্য দিতে তাদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল।

এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, বিদেশে বসবাসরত উইঘুরদের কণ্ঠরোধ করতে চীন সীমান্তপারের দমন-পীড়নও চালিয়ে যাচ্ছে।

শিনজিয়াংয়ে রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া জোরপূর্বক শ্রমের প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাতেও পড়ছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। গাড়ি, সৌর প্যানেল, পোশাক, সামুদ্রিক খাবার, কৃষিপণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ বিভিন্ন খাত এর সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করে। ওই আইনে শিনজিয়াংয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে উৎপাদিত পণ্য জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত এমন ধারণাকে ভিত্তি ধরে সেগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

একই বছর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও কানাডা শিনজিয়াংয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী চীনা কর্মকর্তাদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

তবে এইচআরডব্লিউ বলছে, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তানের মতো কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ জাতিসংঘে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ থেকে বেইজিংকে রক্ষা করেছে।

থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ গুরুতর নির্যাতনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এমন জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঘটনার পর ২০২৩ সালে কানাডা ১০ হাজার উইঘুর শরণার্থীকে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

২০২২ সালের ৩১ আগস্ট জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর শিনজিয়াং নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ব্যাপক গবেষণা ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হয়, অঞ্চলটিতে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে বেইজিং ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক ২০২৪ সালের আগস্টে স্বীকার করেন, শিনজিয়াংয়ে এখনো অনেক সমস্যাজনক আইন ও নীতি বহাল রয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি চীনের আগের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাব এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঘাটতি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। জুনেও তিনি চীনের নতুন জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতি উন্নয়ন আইন নিয়ে উদ্বেগ জানান। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ওই আইন সংখ্যালঘুদের অধিকার মুছে দেওয়ার বিদ্যমান নীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

তবে ২০২২ সালের প্রতিবেদনের পর থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর শিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের চলমান পর্যবেক্ষণের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রকাশ্য হালনাগাদ দেয়নি বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে বিভিন্ন অঞ্চল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দেশগুলোকে একসঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী যৌথ বিবৃতি দিতে হবে।

সংস্থাটি শিনজিয়াং পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা আয়োজন এবং ২০২২ সালের জাতিসংঘ প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

এ ছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও জাপানসহ আরও দেশকে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধে আইন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও তাদের জোরপূর্বক শ্রমবিষয়ক ডেটাবেসে শিনজিয়াংকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইয়ালকুন উলুইওল বলেন, শিনজিয়াংয়ে ১০ বছরের দমন-পীড়নের পরও সরকারগুলো চীনা কর্তৃপক্ষকে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে খুব কমই করেছে।

তার মতে, উইঘুরদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রম ঠেকাতে আমদানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়ানো উচিত।