ছবি: গ্রাফিক্স
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাগোস দ্বীপপুঞ্জ কিনে নেওয়ার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে মরিশাসের কাছে দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের পরিকল্পনা স্থবির হয়ে পড়ার পর বিকল্প পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন।
এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ব্যাপারে মন্তব্য চাইলেও হোয়াইট হাউস আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কাছে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনাধীন প্রস্তাবগুলোর একটি হলো যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি দ্বীপপুঞ্জটি কিনে নেওয়া। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে এমন কোনো চুক্তি বাস্তবায়নের আগে দ্বীপপুঞ্জটির সার্বভৌম মর্যাদা নির্ধারণ করতে হবে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র মরিশাসের সঙ্গে সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। গত এপ্রিলে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে হস্তান্তরের জন্য প্রস্তাবিত আইনগত উদ্যোগগুলো স্থগিত হয়ে যায়, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তির থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাগোস কেনার ধারণাটি বর্তমানে বিবেচনাধীন একাধিক বিকল্পের মধ্যে একটি। এই প্রস্তাবটি ট্রাম্পের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তবে প্রশাসনের ভেতরে এটি এখনো প্রধান বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মরিশাসের কাছে দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করা হলে তা চীনের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, চীনের মিত্র হিসেবে বিবেচিত মরিশাসের মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এদিকে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সফররত চাগোস রিফিউজি গ্রুপের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অভিযোগ করেছে, দ্বীপপুঞ্জের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক ব্রিটিশ রাজনীতির অভ্যন্তরে আটকে পড়েছে। প্রতিনিধি দলের নেতা লুই অলিভিয়ে ব্যানকুল্ট বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে অধিকার প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের অধিকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জনগণের জন্য সমাধান খুঁজে বের করার প্রকৃত সদিচ্ছা ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। আমাদের অবশ্যই একটি পথ বের করতে হবে। আমরা এখনো ভোগান্তির মধ্যে আছি এবং আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। আমাদের জন্মভূমিতে বসবাস করার অধিকার রয়েছে।’
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে নতুন করে আলোচনার পেছনে বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
মধ্য ভারত মহাসাগরে অবস্থিত এই ঘাঁটি ইরান থেকে প্রায় ২ হাজার ৩৬০ মাইল বা ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে। এখানে এমন একটি বিমানঘাঁটি রয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করতে পারে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ইতোমধ্যে দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। মার্চের শেষ দিকে পরিচালিত একটি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ প্রতিহত করে। মার্চ মাসেই যুক্তরাজ্য দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর অনুমতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রকে।
এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ট্রাম্প আগে বলেছিলেন, অনুমোদনটি ‘খুব দেরিতে’ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আরও আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।
চাগোস প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি পরিস্থিতির উত্তরাধিকার পেয়েছে, যেখানে দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির ওপর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ হুমকির মুখে ছিল। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং প্রতিপক্ষ শক্তিকে ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি ছিল।
ওই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘দিয়েগো গার্সিয়া যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামরিক সম্পদ। প্রায় ৬০ বছর ধরে এটি আমাদের যৌথ নিরাপত্তা রক্ষা করে আসছে। দিয়েগো গার্সিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বজায় রাখাই যুক্তরাজ্য-মরিশাস চুক্তির মূল ভিত্তি। এই চুক্তি এমন দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির বাস্তবতা থেকে এসেছে, যার বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই অবগত।’
যুক্তরাষ্ট্র যদি সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিরোধিতা করে, তবুও ব্রিটেন কি মরিশাসের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়ন করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘আমরা সবসময় পরিষ্কার করে বলেছি, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া আমরা এই চুক্তি নিয়ে এগোব না।’
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে নতুন এই আলোচনা ভারত মহাসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সামরিক সহযোগিতা, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নতুন ভূরাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আগামী মাসগুলোতে এই দ্বীপপুঞ্জের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও তৎপরতা দেখা যেতে পারে।
এই বিভাগের অন্যান্য খবর
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: