ইসরায়েলের নির্বাচনে এক্সিট পোলে অচলাবস্থার ইঙ্গিত

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৩৫

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় দেশটি গভীরভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার পর এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন। বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

বুধবার দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট দুজনই সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোট-পরবর্তী জরিপে দেখা গেছে, সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিতে নবাগত আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এবং নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী শিবির প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে। তবে সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে উভয় জোটই অনেক দূরে রয়েছে।

ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কের ভোট-পরবর্তী জরিপে উভয় জোটের জন্য প্রায় ৫১টি করে আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম। প্রাথমিক জরিপগুলোতে অবশ্য বিরোধী জোট এগিয়ে ছিল।

ইসরায়েলি আরব দলগুলো ১৭ থেকে ১৮টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের প্রায়ই অবমাননাকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে ইসরায়েলের কয়েকটি আরব অধ্যুষিত এলাকায় প্রায় সর্বজনীন ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে।

কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির এ নির্বাচনে ভোটাররা নেতানিয়াহুর বিভাজনমূলক শাসনের বিষয়ে তাদের রায় দিয়েছেন। ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দেশটিকে আরও ডানপন্থার দিকে নিয়ে গেছেন এবং হামাসের ওই হামলার জবাবে ধারাবাহিক যুদ্ধ শুরু করেছেন।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ায় ইসরায়েলি আরব দলগুলো সবচেয়ে বেশি আসন অর্জনের আভাস পেয়েছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, সংখ্যালঘু আরব জনগোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ইসরায়েলকে যে ইহুদি জাতীয়তাবাদী পথে তিনি পরিচালিত করছেন, তা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বুধবার রাত ৩টার পর জেরুজালেমের একটি সম্মেলনকেন্দ্রে উল্লসিত সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দেন ৭৭ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তিনি ডানপন্থীদের একটি শক্তিশালী সরকার গঠন এবং ইহুদি ও জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠদের ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানান।

নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের মিত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েলের সামনে ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে নির্মূল করার এক অনন্য সুযোগ রয়েছে।”

এদিকে, তেল আবিবে নিজের সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইজেনকোট নেতানিয়াহুকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতানিয়াহু জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য যুদ্ধকে কাজে লাগাতে পারেন।

আইজেনকোট বলেন, “নেতানিয়াহু, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করার সাহস করবেন না।”

দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তারা নেতানিয়াহুর নয়, রাষ্ট্রের সেবা করেন। তিনি নেতানিয়াহুকে জনসমর্থনহীন ও জনগণের আস্থাবিহীন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী বলে অভিহিত করেন।

১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ প্রায় ৭৮% ভোটার উপস্থিতির পর আইজেনকোট বলেন, দ্বিতীয়বার নির্বাচন আয়োজন করা হবে ভুল সিদ্ধান্ত। তিনি দ্রুত সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

আইজেনকোট বলেন, “জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। একজন যোগ্য নেতা জনগণের অনাস্থার রায় মেনে নিয়ে আজই রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দিতেন।”

ইসরাইলি আরবদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মানসুর আব্বাস বলেন, তার বিশ্বাস, ডানপন্থীরা বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে। তিনি আইজেনকোটের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহও প্রকাশ করেন।

তবে নির্বাচনী প্রচারের সময় আইজেনকোট ইসরায়েলি আরব আইনপ্রণেতাদের নিয়ে সরকার গঠন করবেন না বলে জানিয়েছিলেন। নেতানিয়াহুও আবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, আরবদের ভোটের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারের বৈধতা থাকবে না।

ইসরায়েলি আরব আইনপ্রণেতারা জোট সরকারে যোগ না দিয়েও সংসদে বিভিন্ন ভোটাভুটিতে আইজেনকোটকে সমর্থন দিয়ে সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রাখতে পারেন। তা সম্ভব না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন হতে পারে।

কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন গভির, যিনি ভোট-পরবর্তী জরিপ অনুযায়ী প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পেয়েছেন, নেতানিয়াহুকে আরেকটি বিকল্পের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সেটি হলো আইজেনকোটের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন।

ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বেন গভির বলেন, “এটি হবে ভয়াবহ ভুল।” এমন কোনো ঐক্যের সরকার গঠিত হলে তাতে তার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রসঙ্গত, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে দুর্নীতির মামলাও চলছে। ক্ষমতা হারালে এসব মামলায় তার কারাদণ্ড হতে পারে।

অন্যদিকে, আইজেনকোট রাজনীতিতে নবাগত। তার শান্ত ও সংযত আচরণ দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতানিয়াহুর সাবলীল বক্তৃতাশৈলীর সম্পূর্ণ বিপরীত। মরক্কো থেকে আসা শ্রমজীবী ইহুদি অভিবাসীদের সন্তান আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে তিনি ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত প্রথম প্রধানমন্ত্রী হবেন।

ভোট দেওয়ার আগে ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট গাজায় যুদ্ধে নিহত তার ছেলে গালের কবরে শ্রদ্ধা জানান। ছেলের মৃত্যুতে ইসরায়েলের বহু মানুষের সহমর্মিতা অর্জন করেছেন তিনি।